All posts by jitu

গণমাধ্যমের কেমন সংস্কার চাই

 

আহসান কামরুল

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের তোড়ে প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে শেখ হাসিনার পলায়নের পরপরই দেশের সংবাদমাধ্যমের ওপর নজিরবিহীন হামলা হয়েছে। এটি ছিল সংবাদমাধ্যমের ওপর জনতার চরম ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ। সংবাদমাধ্যমকে এমন টার্গেট করা ঠিক হয়েছে কিনা, সেটি ভিন্ন আলোচনা। কিন্তু সংবাদমাধ্যম কেন এমন টার্গেট হলো? স্বৈরাচারের ১৫ বছরে মিডিয়া কি কখনও গণমাধ্যম হওয়ার চেষ্টা করেছে? নাকি শুধু সংবাদমাধ্যম হিসেবেই ক্ষমতাসীনদের ফুট-ফরমায়েশ খেটেছে? বড়দাগে বলতে গেলে দু’চারটি মিডিয়া হাউজ ব্যতীত অন্য কেউই গণমাধ্যম হওয়ার ন্যূনতম চেষ্টা করেনি। এরা বরং নিজে থেকে যেচে গিয়ে ফুট-ফরমায়েশ খেটে গৌরববোধ করেছে। এ কারণে তারা গণমানুষ থেকে ধীরে ধীরে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে প্রতিপক্ষে রূপ নেওয়ার কারণেই শেখ হাসিনার পলায়নের পর ওই ক্ষোভ গিয়ে উগড়ে পড়েছে মিডিয়া হাউজগুলোর ওপর। বিক্ষুব্ধ জনতা একের পর এক ভেঙেছে সংবাদমাধ্যমের কার্যালয়। এটি বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমের ইতিহাসের জন্যও একটি কলঙ্কজনক অধ্যায় হয়ে থাকবে। একইসাথে সংবাদমাধ্যম সংশ্লিষ্টদের জন্যও শিক্ষণীয় হয়ে থাকবে যে, ভবিষ্যতে তারা গণমাধ্যম হিসেবে সাংবাদিকতা করবে নাকি ফুট-ফরমায়েশি করে আবারও কোনো পালাবদলে আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু হবে।

শেখ হাসিনার পলায়নের পর অন্তবর্তী সরকার গঠন হলে দেশের বিভিন্ন খাতে সংস্কারের দাবি ওঠে। গণআন্দোলনের সময়ও এটি ছিল আন্দোলনকারীদের অন্যতম দাবি ও কমিটমেন্ট। এর পরিপ্রেক্ষিতে কয়েকটি সংস্কার কমিশনও গঠন হয়েছে, যার মধ্যে ‘গণমাধ্যম সংস্কার কমিশন’ও অন্যতম। জুলাই গণআন্দোলনে মিডিয়ার যে ভূমিকা ছিল তা অবশ্যই নিন্দনীয়। ধারাবাহিকভাবে আন্দোলনকারীদেরকে তৎকালীন সরকারের প্রেসক্রিপশন অনুযায়ী ‘দুর্বৃত্ত, নাশকতাকারী’ ইত্যাদি বলেছিল বেশিরভাগ সংবাদমাধ্যম। শেখ হাসিনার প্রেস সচিব নাঈমুল ইসলাম খানের নির্দেশনা অনুযায়ী মিডিয়া এসব কাজ করেছিল বা করতে বাধ্য হয়েছিল। এক্ষেত্রে বাধ্য হওয়ার ঘটনা খুবই কম। গণভবন থেকে নির্দেশনা পাওয়ার সাথে সাথেই বেশিরভাগ মিডিয়া সেই অনুযায়ী ‘হুক্কাহুয়া’ বলতে শুরু করেছিল। গণভবন থেকে পাঠানো নির্দেশনা যেন ছিল মিডিয়ার প্রতি লজ্জাবতীর ছোঁয়া, স্পর্শের সাথে সাথেই তারা গুটিসুটি হয়ে চুপসে গিয়েছিল। অথচ এটি মিডিয়ার চরিত্রের সাথে যায় না। সাংবাদিকদের হওয়া উচিৎ সাহসী। অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী। যেমনটা কাজী নজরুল ইসলামের ভাষায় সেসময় (৩১ জুলাই ২০২৪) বলেছিলাম:
‘‘আমি সেই দিন হব শান্ত,
যবে উৎপীড়িতের ক্রন্দন-রোল, আকাশে বাতাসে ধ্বনিবে না,
অত্যাচারীর খড়গ কৃপাণ ভীম রণ-ভূমে রণিবে না-
বিদ্রোহী রণ-ক্লান্ত
আমি সেই দিন হব শান্ত!’’

মিডিয়া কেন লজ্জাবতীর মতো চুপসে গিয়েছিল

জুলাই গণআন্দোলন যখন তুঙ্গে, সামাল দেওয়ার পরিস্থিতি নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছিল, তখন শেখ হাসিনা ইন্টারনেট বন্ধ করে গণহত্যার পরিকল্পনা গ্রহণ করেছিল। সেসময় পর্যন্তও মিডিয়া সব পক্ষের খবরাখবর পরিবেশন করছিল। ইন্টারনেট বন্ধের পর মিডিয়ার প্রতি নির্দেশনা জারি করেন শেখ হাসিনার প্রেস সচিব নাঈমুল ইসলাম খান। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে বেশ কয়েকটি মুঠোফোন মেসেজে তিনি শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের নিউজ প্রচার করতে নিষেধ করেন। শিক্ষার্থীদের আন্দোলনকে নেতিবাচকভাবে তুলে ধরতে বলেন তিনি। এরপর থেকেই পাল্টে যায় সংবাদমাধ্যমের চরিত্র। খবরে আরোপ হয় সেন্সরশিপ। সব টেলিভিশন যেন হয়ে যায় বিটিভি। সরকার কীভাবে সফলতার সাথে আন্দোলন দমন করছে সেটি প্রচার করাই যেন হয়ে উঠে টেলিভিশনগুলোর খবরের মূল বিষয়বস্তু। সেসময় অবশ্য গুটিকয়েক পত্রিকা ভিন্নরূপে আবির্ভূত হয়েছিল। শেখ হাসিনা সরকারের প্রেস সচিবের প্রেসক্রিপশন উপেক্ষা করে ছাত্র-জনতা নিহতের খবরাখবর প্রকাশ করতে থাকে। এছাড়া মানবিক কিছু প্রতিবেদনও প্রকাশ করে তারা। এর ফলে আন্দোলন আরও বেগবান হয়। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর অবশ্য সেসব মনে রাখা হয়নি।

গণমাধ্যমে কেমন সংস্কার প্রয়োজন

দেশে ৯০ পরবর্তী সময়ে কর্পোরেট সংবাদধ্যম পুঁজির কাছে কুক্ষিগত হতে শুরু করে। এরই ধারাবাহিকতায় গণমাধ্যম তার চরিত্র হারিয়ে ক্ষমতার কাছাকাছি থাকার চেষ্টা শুরু করে। এরই ধারাবাহিকতায় গণমাধ্যম ধীরে ধীরে সংবাদমাধ্যমে রূপ নেয়। তবে কর্পোরেট মালিকানায় গেলেও সাংবাদিকতার মানোন্নয়ন সেভাবে হয়নি। বরং খারাপ সাংবাদিকতার চূড়ান্ত নজির আমরা দেখেছি। গত ৩ দশকে সাংবাদিকতা ডালপালা মেলে অনেকটা মহীরুহ হলেও নীতি-নৈতিকতার বাছ-বিচারসহ মানের দিক থেকে সবকিছুই তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে। সেই গণবিচ্ছিন্নতার চূড়ান্ত রূপ আমরা দেখেছি জুলাই-আগস্ট আন্দোলনের সময়। সেই অবস্থা থেকে উত্তরণ করে গণমাধ্যমকে প্রকৃত গণমাধ্যমে রূপান্তর করতে নিম্নোক্ত সংস্কার জরুরি।

১) নিয়োগ সংক্রান্ত সংস্কার

গণমাধ্যম এমন একটা ক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে যে, এখানে নিয়োগ সংক্রান্ত তেমন কোনো নীতিমালা নেই। কোনো মিডিয়া প্রতিষ্ঠানই নিয়োগ সংক্রান্ত কোনো একক নীতিমালা অনুসরণ করে না। এখানে স্বচ্ছতাও নেই। এর ফলে ন্যূনতম অভিজ্ঞতা ছাড়াই পান দোকানদার থেকে কাঠ ব্যবসায়ী, জেলে, মাদক ব্যবসায়ীসহ নানা ক্ষেত্রের দাগী অপরাধীরাও সাংবাদিকতায় ঢুকে যাচ্ছে। ফলাফল স্বরুপ ছড়িয়ে পড়ছে চাটুকারিতা ও অপসাংবাদিকতা। সাংবাদিকতাকে সঠিক পথে রাখতে হলে নিয়োগ সংক্রান্ত সংস্কার প্রয়োজন। এক্ষেত্রে বার কাউন্সিলের মতো পরীক্ষা পদ্ধতি চালু করা যেতে পারে। অন্যদিকে অনেক মিডিয়া হাউজ রয়েছে যারা সাংবাদিকদেরকে নিয়োগপত্র দেয় না। অপেশাদার এমন আচরণ বন্ধ করে বাধ্যতামূলক নিয়োগপত্র দেওয়ার ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। এছাড়া অনেক জায়গায় অর্থের বিনিময়ে নিয়োগ দেওয়ার বিষয়টি ওপেন সিক্রেট। পেশাদারিত্বের বদলে অর্থের বিনিময়ে নিয়োগ কার্যক্রমের বিরুদ্ধে কঠোরভাবে অবস্থান নিতে হবে।

শিক্ষাগত যোগ্যতার বাধ্যবাধকতা

দেশে অপসাংবাদিকতায় বেশিরভাগই করে থাকেন যাদের ন্যূনতম শিক্ষাগত এবং পারিপার্শ্বিক যোগ্যতা নেই। প্রেস কাউন্সিলসহ সাংবাদিকতার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কর্তাব্যক্তিরা বিভিন্ন সময় নানা জায়গায় গিয়ে শিক্ষাগত যোগ্যতার বিষয়ে কথা বলেন। অজ্ঞাত কারণে বিষয়টিকে তারা শুধু কথার মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখেন। অপসাংবাদিকতা রুখতে শিক্ষাগত যোগ্যতার বিষয়টিও সংস্কার প্রক্রিয়ার অন্তর্ভূক্ত করা যেতে পারে।

চাকরির নিশ্চয়তা

পেশাদার সাংবাদিকতায় যারা রয়েছেন, তাদের বেশিরভাগেরই চাকরি নিয়ে এক অজানা আতঙ্ক থাকেন। কখন যেন আকস্মিক নোটিশে চাকরিহারা হতে হয়। সাংবাদিকদের চাকরি থেকে বের করে দেওয়া যেন ছেলের হাতের মোয়া। এমনও অনেকসময় হয় যে, রাতে কাজ করে গিয়ে সকালে শুনতে পান যে তার চাকরি নেই! এই পরিস্থিতি থেকে বের হতে হবে। কোন সাংবাদিককে হুটহাট নোটিশে চাকরি থেকে বের করে দেওয়া যাবে না। কোনো কারণে যদি চাকরি যায়ও, সেটাও যেন আইনানুগ প্রক্রিয়ায় হয়। এতে সাংবাদিকতা অপেশাদারিত্ব থেকে রক্ষা পাবে।

২) বেতন সংক্রান্ত সংস্কার

বিগত কয়েক দশকে সাংবাদিকতা পুঁজির কাছে কুক্ষিগত হলেও এর সুফল পায়নি পেশাদার সাংবাদিকরা। এখনকার বাজারেও ১০-১৫ হাজার টাকা বেতনে গ্র্যাজুয়েট কর্মী খোঁজেন মিডিয়ার কর্তারা! অনেক জায়গায় আবার সেও নেই। বেতন-ভাতা দেওয়া হবে বলে নিয়োগ দিলেও শেষ পর্যন্ত বেতন দেওয়া হয় না। দিলেও সেটি হয় অনিয়মিত। যে কারণে অনেক সংবাদকর্মী অনৈতিক কার্যক্রমে জড়িয়ে পড়েন। যার নেতিবাচক প্রভাব পড়ে সাংবাদিকতা পেশার ওপর। এজন্য নিয়মিত বেতন দেওয়ার পরিবেশ তৈরি করতে হবে। নিয়মিত বেতন দেওয়ার সক্ষমতা না থাকলে মিডিয়া হাউজ থাকার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে বলে মনে হয় না। অবশ্য গ্রুপ অব কোম্পানির অন্যান্য খাতে বেতন-ভাতায় সমস্যা না হলেও মিডিয়ার ক্ষেত্রে ‘দারিদ্রতার চরম রূপ’ পরিলক্ষিত হয়।

ওয়েজবোর্ড সংশোধন

প্রিন্ট মাধ্যমে ওয়েজবোর্ডের বিষয় থাকলেও টেলিভিশন এবং অনলাইন মাধ্যমে তারও বালাই নেই। সেজন্য কর্তাব্যক্তিরা নিজেদের মনমতো অন্যায্য বেতন নির্ধারণ করেন। প্রিন্টে ওয়েজবোর্ড থাকলেও বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সেটি মানা হয় না। কিছু কিছু জায়গায় মানা হলেও বেশিরভাগ ক্ষেত্রে কাগজে-কলমে ওয়েজবোর্ড বাস্তবায়ন দেখিয়ে সরকারি সুযোগ সুবিধা নেয় পত্রিকাগুলো। এছাড়া ওয়েজবোর্ড সংশোধন করে টেলিভিশন এবং অনলাইন গণমাধ্যম অন্তর্ভূক্ত করতে হবে। ওয়েজবোর্ড যথাযথভাবে বাস্তবায়ন হচ্ছে কিনা সেটি মনিটরিং করতে হবে। প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিবও এ বিষয়ে কথা বলেছেন। তিনি ওয়েজবোর্ড বাতিল করে ন্যূনতম বেতনের সিস্টেম চালু করার কথা বলেছেন। সেটিও আলোচনা সাপেক্ষে বিবেচনায় রাখা যেতে পারে। তবে এক্ষেত্রে আইনের যথাযথ ও কঠোর বাস্তবায়ন হতে হবে। নাহলে আইন বা নিয়ম করে শেষ পর্যন্ত কোনো সুফল পাওয়া যাবে না।

৩) পেশাদারিত্ব সংক্রান্ত সংস্কার

জুলাই-আগস্ট অভ্যুত্থানের সময় আমরা সংবাদমাধ্যমকে লজ্জাবতীর মতো চুপসে যেতে দেখেছি। সেটাও তবু একধরনের অসহায়ত্ব বলে মানা যায়। তবে বেশকিছু সংবাদমাধ্যম আরও কয়েক ধাপ এগিয়ে প্রোপাগান্ডা মেশিনে পরিণত হয়েছিল। পেশাদারিত্বের ন্যূনতম বালাই ছিল না তাদের। জনগণের প্রতিও ছিল না কমিটমেন্ট। স্বউদ্যোগে ওসব মিডিয়া সরকারের পক্ষ নিয়ে বিভ্রান্তিকর ও মিথ্যা তথ্য প্রকাশ করেছে দিনের পর দিন। শেখ হাসিনার স্বৈরাচারী আমলে এভাবেই পেশাদারিত্বের মুণ্ডুপাত করে গিয়েছে কথিত কিছু মিডিয়া। এই সংবাদমাধ্যমগুলো হয়ে উঠেছিল আওয়ামী লীগের গুজব সেল সিআরআই এর প্রোপাগাণ্ডা মেশিন। বিরোধী নেতাদের ব্যক্তিগত ফোনকল প্রচার, চরিত্র হনন থেকে শুরু করে নীতি-নৈতিকতার বলাৎকারসহ এমন কিছু নেই, যা কথিত সেই সংবাদমাধ্যমগুলো করেনি। এমন যাতে আর কখনও কেউ করতে না পারে, সেজন্য লাগাম টেনে ধরার ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। এক্ষেত্রে অপেশাদার আচরণ করে এমন কাউকে সংবাদমাধ্যমে রাখা যাবে না। অন্যদিকে মালিকপক্ষও নানা সুবিধা পেতে নিউজরুমের কাছে অন্যায় আবদার করে থাকেন। অপেশাদার আচরণ করে তারা যাতে পার না পান, তার ব্যবস্থা থাকা জরুরি। এজন্য সংবাদমাধ্যমের মালিক, সম্পাদক এবং সাংবাদিকসহ সবার দলীয় লেজুড়বৃত্তি বন্ধ করতে হবে। এখানে যে যেই মতেরই হোক না কেন, শতভাগ পেশাদারিত্ব বজায় রাখতে হবে। এছাড়া সরকারও যাতে স্বাধীন সাংবাদিকতায় কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ করতে না পারে, সেটি নিশ্চিত করতে হবে। এক্ষেত্রে সাইবার আইনসহ সকল কালাকানুন বাতিল করা জরুরি।

প্রেস কাউন্সিল শক্তিশালীকরণ

পেশাদার সাংবাদিকতা করতে গিয়ে সাংবাদিকরা নানাভাবে হয়রানি ও মামলা-হামলার শিকার হন। সেজন্য প্রেস কাউন্সিলকে আরও শক্তিশালী করতে হবে। থানা বা কোর্টে নয়, সংবাদ সংক্রান্ত সব মামলা প্রেস কাউন্সিলে করতে হবে। প্রেস কাউন্সিলের অনুমতি বা অবগতি ব্যতীত সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে সংবাদ সংক্রান্ত মামলা করতে না দেওয়ার বিষয়টিও বিবেচনায় নেওয়া যেতে পারে। সংবাদ প্রকাশের জন্য সাংবাদিককে কোনো ধরনের হুমকি দেওয়া বা হামলা করা হলে কঠোরভাবে প্রতিহত করার ব্যবস্থা করতে হবে।

৪) নিবন্ধন সংক্রান্ত সংস্কার

দেশে সংবাদমাধ্যমের নিবন্ধন প্রক্রিয়া এখনও যেন সেই ব্রিটিশ আমলে পড়ে রয়েছে। কেউ যদি যথাযথভাবে সংবাদমাধ্যমের নিবন্ধন পাওয়ার যোগ্য হয়, সেক্ষেত্রে দ্রুততম সময়ে আবেদন নিষ্পত্তি করতে হবে। আবেদন প্রক্রিয়াও অনলাইনভিত্তিক করা জরুরি। তথ্যপ্রযুক্তির এ যুগে এসেও মান্ধাতার আমলের মতো এ অফিস সে অফিস করে মাসের পর মাস কাটিয়ে দেওয়া যৌক্তিক বিষয় নয়। এছাড়া নিবন্ধন পেতে হয়রানি, ঘুষ দাবিসহ সব ধরনের অনিয়মের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করার ব্যবস্থা রাখতে হবে। পুলিশ ভেরিফিকেশনের নামে সংবাদমাধ্যমের অবমূল্যায়ন ও হয়রানি বন্ধ করে যেকোন এক জায়গায় সংবাদমাধ্যমের নিবন্ধন সংক্রান্ত বিশেষ সেল রাখা যেতে পারে। ভেরিফিকেশন থেকে শুরু করে নিবন্ধনসহ সবকিছু বিশেষ সেলের অভিজ্ঞ কর্মকর্তারা করবেন। একইসাথে কালো টাকার মালিক, অসাধু ব্যবসায়ী, সন্ত্রাসী গোষ্ঠী, মাফিয়া চক্রসহ অপেশাদার কাউকে সংবাদমাধ্যমের নিবন্ধন দেওয়া যাবে না। পেশাদারিত্বের বদলে সংবাদমাধ্যমকে ব্যবহার করে ব্যক্তি বা গোষ্ঠী স্বার্থ কায়েমের চেষ্টা বন্ধ করতে হলে এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতেই হবে।

স্বৈরাচারের আগে-পরে আমরা লক্ষ্য করেছি যে, কোনো রিপোর্ট সরকারের পছন্দ না হলে সংবাদমাধ্যম বন্ধ করে দেওয়া হয়। এটি খুবই খারাপ দৃষ্টান্ত। টেলিভিশন-পত্রিকার জন্য বিষয়টি কিছুটা জটিল হলেও অনলাইন সংবাদমাধ্যমের ক্ষেত্রে খুবই সহজ। বিটিআরসি নিবন্ধন কর্তৃপক্ষ না হলেও এই প্রতিষ্ঠানকে ব্যবহার করে বহু অনলাইন মিডিয়া বন্ধ করা হয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকার ৫৪টি অনলাইন বন্ধ করার ক্ষেত্রে কোন ধরনের নিয়মনীতির তোয়াক্কা করেনি। আইন না মানলে নিবন্ধন স্থগিত ব্যতীত অনলাইন সংবাদমাধ্যমসহ কোনো মিডিয়াই যেন সরকার বন্ধ করতে না পারে সেই ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। এরপরও সরকার কোনো সংবাদমাধ্যম বন্ধ করলে সরকারকে অন্তত ৬ মাস ওই মিডিয়ার সকল কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন বহন করতে হবে। স্বাধীন বিচার বিভাগের মতো করেই সরকার যেন নিবন্ধন ইস্যু বা অন্য কোনভাবেই মিডিয়ার ওপর কোন ধরনের হস্তক্ষেপ অথবা খবরদারি করতে না পারে সংস্কারের মাধ্যমে সেই ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

৫) বিজ্ঞাপন সংক্রান্ত সংস্কার

চলচ্চিত্র ও প্রকাশনা অধিদপ্তর বর্তমানে প্রিন্ট পত্রিকার প্রচার সংখ্যা ও বিজ্ঞাপন হার নির্ধারণ করে থাকে। এখানে অনেক শুভঙ্করের ফাঁকি রয়েছে। যেসব পত্রিকা দৈনিক ৫০০ কপিও ছাপা হয় না, সেসব পত্রিকা লাখ লাখ কপি ছাপানোর ভুয়া তথ্য দেখিয়ে টাকার বিনিময়ে বেশি বিজ্ঞাপন রেট নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। অর্থের বিনিময়ে রেট আপ-ডাউন করানো বন্ধের বিষয়টি বিবেচনায় নিতে হবে। এছাড়া ৯০০ টাকা রেট দিয়ে এখনকার সময়ে কতটুকু টিকে থাকা যায় সেটিও বিবেচ্য বিষয়। এখনকার মুদ্রাস্ফীতি বিবেচনায় রেট আরও অন্তত ৫০ শতাংশ বাড়ানো যায় কিনা সেটিও ভেবে দেখা যেতে পারে। একই কথা রেডিও, টেলিভিশন ও অনলাইন মাধ্যমের জন্যও প্রযোজ্য। সেসব মিডিয়ার জন্যও বিজ্ঞাপন নীতিমালা করা সময়ের দাবি। এছাড়া সামগ্রিক মিডিয়াকে শিল্প ঘোষণা করে এই শিল্পের বিকাশে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। সরকারি বিজ্ঞাপনের বিল দ্রুততম সময়ের মধ্যে দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। এছাড়া বিগত দিনে আমরা দেখেছি, সরকারের পছন্দমতো সংবাদ না করলে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে হুমকি দিয়ে বিজ্ঞাপন বন্ধ করা হয়েছে। সংবাদের কারণে কোনো গণমাধ্যমের বিজ্ঞাপন বন্ধ করাকে অপরাধ হিসেবে অন্তর্ভূক্ত করা যেতে পারে। এটি প্রমাণ হলে অপরাধীদের কঠোর শাস্তি বা যে পদেই থাকুক না কেন পদচ্যুত করার বিধান থাকতে হবে।

৬) মিডিয়া সিটি তৈরি

বাংলাদেশে মিডিয়া হাউজগুলো পুরো শহরজুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকলেও এটি কোনো আদর্শ পন্থা নয়। সেক্ষেত্রে মিডিয়া সিটি তৈরি করা যেতে পারে। সেখানে স্বল্পমূল্যে একই ভবনে একাধিক মিডিয়া হাউজের অফিস থাকবে। এটা উৎকৃষ্ট পদ্ধতি হতে পারে। দেশের সবগুলো সংবাদমাধ্যম প্রতিষ্ঠান এক এলাকায় থাকলে সব দিক থেকেই সুবিধা রয়েছে। সংবাদমাধ্যমের অফিস ছাড়াও সেখানে বা পাশাপাশি কোথাও সংবাদকর্মীদের জন্য আবাসন ব্যবস্থাও তৈরি করা যেতে পারে।

৭) ঐক্যবদ্ধ ও শক্তিশালী সাংবাদিক ইউনিয়ন

সংবাদকর্মীদের অধিকার রক্ষায় সাংবাদিক ইউনিয়নের প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। কিন্তু দুঃখজনকভাবে হলেও সত্য যে, ’৯০ পরবর্তী কথিত গণতান্ত্রিক সরকারগুলোর সময়ে ঐক্যবদ্ধ ইউনিয়ন দ্বিধাবিভক্ত হয়েছে। সংবাদকর্মীদের অধিকার রক্ষার বদলে সাংবাদিক ইউনিয়নগুলো হয়েছে দলীয় লেজুড়বৃত্তির আঁতুড়ঘর। নির্লজ্জভাবে দলীয় লেজুরবৃত্তি করাই হয়েছে তাদের একমাত্র প্রধান কাজ। সাংবাদিকতার আজকের দুর্দিনের জন্য এটিও অন্যতম কারণ। সেজন্য সাংবাদিক ইউনিয়নকে পেশাজীবী সংগঠন করতে হবে। এই সংগঠনগুলো যাতে কোনভাবেই দলীয় রাজনীতির হাতিয়ার হতে না পারে সেই ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

এসব বিষয়গুলো ছাড়াও পেশাজীবী সাংবাদিক, মালিকপক্ষসহ পেশা সংক্রান্ত বিশেষজ্ঞদের সাথে আলোচনা করে আরও প্রয়োজনীয় বিষয় নির্ণয় করে সংস্কার কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে। এর উদ্দেশ্য হলো: সাংবাদিকতা যেন সবসময় সঠিকপথে থাকে। কোন অশুভ শক্তি যেন সাংবাদিকতাকে নিয়ন্ত্রণ করতে না পারে। হোক সেটা সরকার, মালিকপক্ষ, সাংবাদিক বা যেকোন পক্ষ থেকেই। কেউ যেন সাংবাদিকতার গতিপথ রুদ্ধ করতে না পারে কিংবা গতিপথ পাল্টে দিতে না পারে। গণমানুষের জন্যই হোক পেশাদার গণমাধ্যম, এটাই সংস্কারের মূল উদ্দেশ্য হতে হবে।

লেখক: সাংবাদিক; প্রধান সমন্বয়ক, মিডিয়া মনিটর।
ইমেইল: ahsankamrul91@gmail.com

কুমিল্লায় আন্তঃক্যাডার বৈষম্য নিরসন পরিষদের মানববন্ধন

কুমিল্লায় আন্তঃক্যাডার বৈষম্য নিরসন পরিষদের মানববন্ধন

স্টাফ রিপোর্টার:

জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন প্রস্তাবিত উপসচিব পুলে কোটা পদ্ধতি বহাল এবং শিক্ষা ও স্বাস্থ্য ক্যাডারকে সিভিল সার্ভিস সার্ভিসের বহির্ভূতকরণের প্রতিবাদে সারাদেশের ন্যায় কুমিল্লা জেলায় মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করা হয়েছে।

বৃহস্পতিবার (২৬ ডিসেম্বর) সকালে শহরের কান্দিরপাড়স্থ পূবালী চত্ত্বরে এ কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়।

জনপ্রশাসন সংস্কারের লক্ষ্যে গঠিত কমিশন কর্তৃক উপসচিব পুলে প্রশাসন ক্যাডারের জন্য ৫০% কোটা রেখে অন্যান্য ২৫টি ক্যাডারের জন্য ৫০% মেধার ভিত্তিতে নিয়োগ এবং শিক্ষা ও স্বাস্থ্য ক্যাডারকে সিভিল সার্ভিস হতে আলাদা করার সুপারিশের সিদ্ধান্তের প্রেক্ষিতে এ কর্মসূচি পালিত হয়।

কর্মসূচিতে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের, উপপরিচালক আইউব মাহমুদ, কুমিল্লা সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক মোঃ নূরুর রহমান খান, নওয়াব ফয়জুন্নেসা সরকারি কলেজের সহযোগী অধ্যাপক মোঃ আক্তার হোসেন খান, কুমিল্লা বিসিএস হেলথ ক্যাডার এসোসিয়েশনের সদস্য-সচিব ডা. তাছলিমা বেগম (তুলি), চট্টগ্রাম বিভাগ মৎস্য অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোঃ আনোয়ার হোসেন, জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা চন্দন কুমার পোদ্দার বক্তব্য রাখেন।

মানববন্ধনকালে বক্তারা বলেন, নতুন বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে গঠিত সংস্কার কমিশনসমূহের মধ্যে জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ সরকারের সকল নীতি নির্ধারণ এবং বাস্তবায়নে নেতৃত্ব প্রদান করে সিভিল প্রশাসন; যা বর্তমানে ২৬টি ক্যাডার নিয়ে গঠিত। যেখানে কার্যকর রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়তে বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিসের আমূল পরিবর্তন দরকার, সেখানে জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন বৈষম্যমূলকভাবে উপসিচব পুলে একটি ক্যাডারের জন্য ৫০% কোটা সুপারিশের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে মিডিয়ার সামনে উপস্থাপন করায় সিভিল সার্ভিসের অন্য ২৫টি ক্যাডারের সদস্যদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। বক্তারা আরো বলেন, কমিশনের এ সকল সিদ্ধান্তের সুযোগ নিয়ে একটি মহল ইতোমধ্যে বিভিন্ন বিভ্রান্তিকর ও উদ্দেশ্যমূলক তথ্য প্রচার শুরু করেছে। সিনিয়র সার্ভিস পুল (বা উপসচিব পুল) এর পদসমূহ কোনো নির্দিষ্ট ক্যাডারের নয়। Service Act 1975 অনুযায়ী মেধার ভিত্তিতে এ সকল পদে নিয়োগের কথা থাকলেও বিভিন্ন অজুহাতে কোটা পদ্ধতি চালু রেখেছে প্রশাসন ক্যাডার। এছাড়া ২০১৮ সালের নির্বাচনের পর Service Act 1975 রহিত করে ২০২৪ এর নির্বাচনের পর এ সকল পদ নিজেদের তফসিলে অন্তর্ভুক্ত করেছে প্রশাসন ক্যাডার, যা মেধাভিত্তিক জনকল্যাণমূলক রাষ্ট্রগঠনে মারাত্মক অন্তরায়।

মানবন্ধন কর্মসূচিতে সিভিল সার্ভিসের কার্যকর সেবা নিশ্চিত করতে আন্তঃক্যাডার বৈষম্য নিরসন পরিষদ হতে কৃত্য পেশাভিত্তিক মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠার দাবি করা হয়। বর্তমানে প্রতিটি সেক্টরে নীতি নির্ধারণ, পরিকল্পনা প্রণয়ন ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ করছেন প্রশাসন ক্যাডারের সদস্যরা যারা সেই সেক্টর সম্পর্কে অনভিজ্ঞ ও অদক্ষ। ফলে সেক্টরগুলো কাঙ্ক্ষিত জনসেবা নিশ্চিত করতে পারছে না। তাছাড়া সকল সেক্টরে একটি ক্যাডারের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ থাকায় সৃষ্ট আমলাতান্ত্রিক সিন্ডিকেট, অব্যবস্থাপনা, দুর্নীতি ও বৈষম্য রাষ্ট্রের সকল সেক্টরকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে গেছে। দেশের মানুষ প্রকৃত জনসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। জনবান্ধব সরকারের পরিবর্তে দেশে বিভিন্ন সময়ে গড়ে উঠেছে জনবিচ্ছিন্ন স্বৈরাচারী সরকার। তাই জনবান্ধব পেশাদার সিভিল সার্ভিস গড়তে প্রতিটি মন্ত্রণালয় স্ব স্ব ক্যাডারের অভিজ্ঞ ও দক্ষ কর্মকর্তা দ্বারা পরিচালনার বিকল্প নেই।

মানববন্ধনকালে গত ২৫ ডিসেম্বর দিবাগত রাতে বাংলাদেশ সচিবালয়ের ৭ নম্বর ভবনে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় অগ্নি নির্বাপনকালে ফায়ার সার্ভিসের কর্মী নিহতের ঘটনায় গভীর শোক প্রকাশ করা হয়। এছাড়া অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় দোষীদের দ্রুত চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনার দাবি জানানো হয়।

সচিবালয়ের অগ্নিকান্ডে জড়িতদের খুঁজে বের করে শাস্তির দাবি ফখরুলের

সচিবালয়ের অগ্নিকান্ডে জড়িতদের খুঁজে বের করে শাস্তির দাবি ফখরুলের

ডেস্ক রিপোর্ট:

সচিবালয়ে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনার পেছনে জড়িতদের খুঁজে বের করে শাস্তির আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। বৃহস্পতিবার (আজ) সংবাদমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে তিনি এই দাবি তোলেন।

বিএনপি মহাসচিব বলেন, “সচিবালয়ের মতো স্পর্শকাতর স্থাপনায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড, একজনের মৃত্যু এবং ২-৩ জনের আহত হওয়ার ঘটনায় আমি গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। এই অগ্নিকাণ্ডের ফলে গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র পুড়ে ভস্মীভূত হওয়ায় দেশের অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে। বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় এ ধরনের ঘটনা ঘটায় এদের দায় এড়ানো অস্বাভাবিক নয়।”

তিনি আরও বলেন, “সচিবালয়ে অগ্নিকাণ্ডের সুষ্ঠু তদন্ত করে প্রকৃত দোষীদের শনাক্ত করে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য আমি জোর দাবি জানাই। এছাড়াও নিহতের পরিবার এবং আহতদের ক্ষতিপূরণ প্রদানের জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানাই।”

অনির্বাচিতরা দীর্ঘদিন থাকলে

অনির্বাচিতরা দীর্ঘদিন থাকলে অপকর্মে জড়ানোর শঙ্কা

অনির্বাচিতরা দীর্ঘদিন থাকলে অপকর্মে জড়ানোর শঙ্কা

ডেস্ক রিপোর্ট:

বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ও সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সম্পাদক ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল বলেছেন, আগামী ছয় মাসের মধ্যে সংস্কার কার্যক্রম সম্পন্ন করে ২০২৫ সালের তিন-চতুর্থাংশের মধ্যেই নির্বাচন অনুষ্ঠান সম্ভব। এ সময়কালের মধ্যেই সরকারের যেসব এজেন্ডা অর্থাৎ সংস্কার কাজ রয়েছে সেগুলো সম্পন্ন করে নির্বাচন করতে পারবে।

বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের এ সদস্য আরও বলেছেন, অনির্বাচিত সরকারের কোনো জনভিত্তি থাকে না। জনভিত্তি ছাড়া দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকা কঠিন। অনির্বাচিত সরকার দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকলে সরকারসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিভিন্ন অপকর্মে জড়িত হওয়ার শঙ্কা তৈরি হয়। সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে তিনি এ মন্তব্য করেন।

সাক্ষাৎকারের বিস্তারিত:-

অন্তর্বর্তী সরকারের সাড়ে চার মাসে আপনার প্রত্যাশা এবং প্রাপ্তি সম্পর্কে বলুন।

কাজল: দীর্ঘদিনের ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্র ব্যবস্থার জাঁতাকল থেকে মুক্ত হয়ে দেশের মানুষ মুক্ত বাতাসে নিঃশ্বাস নিচ্ছে। স্বাধীনভাবে কথা বলতে পারছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির কিছুটা নিয়ন্ত্রণহীনতা ব্যতীত ব্যাপক চাঁদাবাজি, ঘুষ, দুর্নীতির যে উৎসব বিগত সরকারের আমলে মানুষ প্রত্যক্ষ করেছে গত চার মাসে এগুলো আমরা লক্ষ্য করিনি। অন্তর্বর্তী সরকার অনেকটাই গণতান্ত্রিক। রাষ্ট্র পরিচালনায় তারা ক্রিয়াশীল রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে নিয়মিত বৈঠক করছে। এর মধ্য দিয়ে জনগণের পালস বা মনোভাব তারা কিছুটা বুঝতে পারছে। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকার অনির্বাচিত সরকার। অনির্বাচিত সরকারের কোনো জনভিত্তি থাকে না। জনভিত্তি ছাড়া দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকা কঠিন। দীর্ঘদিন অনির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় থাকলে সরকার সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিভিন্ন অপকর্মে জড়িত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।

বর্তমান সরকারের বিরুদ্ধে এখনো পর্যন্ত এমন কোনো অভিযোগ ওঠেনি। তবে যে তরুণ প্রজন্মের সংগ্রাম এবং আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে ৫ আগস্টের বিজয় এসেছে সেসব ছাত্রনেতা বা ছাত্র উপদেষ্টাদের কারও বিরুদ্ধে যদি কখনো এমন কোনো অভিযোগ আসে তাহলে এটি হবে আমাদের জন্য অত্যন্ত দুঃখজনক এবং কলঙ্কজনক। সুতরাং, যত দ্রুত সম্ভব নির্বাচনের মাধ্যমে একটি গণতান্ত্রিক এবং রাজনৈতিক সরকার প্রতিষ্ঠা করা সরকার এবং জনগণ উভয়ের জন্য মঙ্গলজনক হবে। সরকার যেসব সংস্কার প্রস্তাব নিয়েছে রাজনৈতিক দলগুলোর ঐকমত্যের ভিত্তিতে সেগুলো চূড়ান্ত করে পরবর্তীতে বাস্তবায়নের জন্য নির্বাচিত সরকারের কাছেই ছেড়ে দিতে হবে।

ছাত্র-জনতার আন্দোলনকে কীভাবে দেখেন? আর এ আন্দোলনে বিএনপির অবদানকে কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?

কাজল: জুলাই-আগস্টের আন্দোলনে সম্মুখ সারিতে ছিল ছাত্র-জনতা। আন্দোলনের মোমেন্টামও তারাই গ্রহণ করেছে। তবে এই আন্দোলনের ভিত্তি তৈরি করেছে বিএনপি। হাসিনার শাসনামলের শুরু থেকেই বিএনপি ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের নানাবিধ অপকর্মের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। এতে করে দলীয়ভাবে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্তও হয়েছে বিএনপি। ইলিয়াস আলীর মতো একজন প্রাজ্ঞ রাজনীতিবিদ গুম হয়েছেন। বর্তমান সরকারের চার মাস পেরিয়ে গেলেও তার পরিবার এখনো জানে না ইলিয়াস আলীর ভাগ্যে কী ঘটেছে। হাজারখানেক মানুষ গুমের শিকার হয়েছেন, ৫০ লক্ষাধিক মানুষ মিথ্যা মামলায় হয়রানির শিকার হয়েছেন। এদের সিংহভাগই বিএনপির।

বিগত সরকারের বিরুদ্ধে বিএনপি ধারাবাহিকভাবে আন্দোলন চালিয়ে এসেছে। সর্বশেষ ৭ জানুয়ারির নির্বাচনের পরও বিএনপি থেমে যায়নি। গত বছর ২৮ অক্টোবর ঢাকায় বিএনপির সমাবেশে সন্ত্রাসী হামলা চালানোর পরও বিএনপি নিয়মতান্ত্রিকভাবে আন্দোলন অব্যাহত রেখেছে। ওইদিন সমাবেশ ব্যর্থ হওয়ার পরদিন বিএনপি হরতাল ডেকেছিল। আওয়ামী সরকার বিএনপি নেতা-কর্মীদের গ্রেপ্তার, মামলা, খুনের মাধ্যমে দেশে ভীতিকর অবস্থার সৃষ্টি করেছিল।

আমি একমাত্র ব্যক্তি যে সুপ্রিম কোর্ট থেকে আইনজীবীদের মিছিল রাজপথে নিয়ে গেছি। সাংগঠনিক চেইন অব কমান্ডের বদৌলতে বিএনপি ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন চলমান রাখতে পেরেছে। আমি নিজেও আইনজীবী হিসেবে গ্রেপ্তারের শিকার হয়েছি।

৫ আগস্ট পূর্ববর্তী সময়ে বিএনপি মহাসচিব প্রথমে দলের পক্ষ থেকে জানিয়েছেন, ছাত্রদের আন্দোলনের প্রতি আমাদের নৈতিক সমর্থন আছে। পরবর্তীতে তিনি বলেছেন, সর্বশক্তি দিয়ে আমরা এ আন্দোলনের সঙ্গে আছি। আন্দোলনকে চূড়ান্ত পর্বে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে যারা ভূমিকা রেখেছে তারা মূলত রাজনৈতিক কর্মী। সরকারবিরোধী রাজনৈতিক শক্তির রাজনৈতিক কর্মীরাই আন্দোলনটাকে চূড়ান্ত মোমেন্টামে তুলে এনেছে। বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর বিরুদ্ধে হাসিনা সরকারের দীর্ঘ দিনের চালানো খুন, গুম, নির্যাতন-নিপীড়ন এবং অধিকার হরণের বিপরীতে মানুষের যে ক্ষোভ তার গণ বিস্ফোরণের সমষ্টিগত ফল হলো ৫ আগস্টের বিপ্লব। সুতরাং এ বিপ্লব কোনো একক ব্যক্তির কিংবা একক গোষ্ঠীর নয়।

সরকারের সংস্কার কার্যক্রমকে কীভাবে মূল্যায়ন করবেন? বিএনপি কোন কোন সংস্কারের প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে?

কাজল: বিএনপি যেসব বিষয়ে সংস্কার করতে চায় তার মধ্যে প্রধান হলো- সংবিধান সংস্কার। বিএনপির পক্ষ থেকে ইতোমধ্যেই সংবিধান সংস্কার কমিটি গঠিত হয়েছে। সাত সদস্য বিশিষ্ট এ কমিটির আমি একজন সদস্য ছিলাম। এ কমিটি ৬৭টি সংস্কারের কথা বলেছে। বিগত আমলগুলোতে প্রধানমন্ত্রী তার একচ্ছত্র ক্ষমতার অপব্যবহার করেছেন। তাই বিএনপি চায়, রাষ্ট্রপতি এবং প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার মধ্যে ভারসাম্য প্রতিষ্ঠিত হোক। দ্বিতীয়ত, দেশের বিদ্যমান রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে শিক্ষাবিদ, চিকিৎসকসহ সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার বিদগ্ধ ব্যক্তিদের রাষ্ট্রপরিচালনায় অংশ নেওয়ার কোনো ব্যবস্থা নেই। এ জন্য বিএনপি, দ্বি-কক্ষ বিশিষ্ট সংসদের প্রস্তাব করেছে। তৃতীয়ত, স্বৈরতান্ত্রিক মনোভাব থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য একই ব্যক্তি পরপর দুবারের বেশি প্রধানমন্ত্রী থাকতে পারবেন না। চতুর্থত, বিএনপি নির্বাচন কমিশনকে শক্তিশালী করার জন্য সংস্কারের কথা বলছে।

সর্বোপরি, বিএনপি ঘোষিত ৩১ দফা সংস্কার প্রস্তাবও অত্যন্ত যুগোপযোগী। এ প্রস্তাবগুলোকে সামনে রেখে আগামী দিনে দেশের সব সেক্টরকে দুর্নীতিমুক্ত এবং নিরপেক্ষভাবে ঢেলে সাজানো সম্ভব।

নির্বাচনি রোডম্যাপ নিয়ে আপনার ভাবনা কী?

কাজল: অন্তর্বর্তী সরকারের মূল দায়িত্ব নির্বাচনের মাধ্যমে রাজনৈতিক সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করা। বর্তমান প্রেক্ষাপটে দেশের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক দল বিএনপি এ সরকারের কাছ থেকে নির্বাচনি রোডম্যাপের প্রত্যাশা করছে। সরকারের যাত্রা শুরু থেকেই বিএনপি বলে আসছে, কিছু সংস্কারের জন্য তারা সরকারকে যৌক্তিক সময় দিতে চায়। যৌক্তিক সময় একেক সময় একেক রকম হয়। উদাহরণস্বরূপ, এক-এগারো সরকারের প্রতি প্রথম দিকে জনগণের যেরকম আস্থা ছিল, দুই বছর থাকার কারণে সেই আস্থায় ঘাটতি দেখা দিয়েছিল। সেই সরকারের দায়িত্বপ্রাপ্ত অনেকেই নানাবিধ দুর্নীতি এবং অনিয়মের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছিলেন। আশঙ্কা প্রকাশ করছি, বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদ দীর্ঘায়িত হলে সরকার সংশ্লিষ্ট অনেক ব্যক্তি এবং প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ক্ষমতাস্পৃহা তৈরি হতে পারে। অনেকের মধ্যে দুর্নীতি ঢুকতে পারে। এ জন্য যত দ্রুত সম্ভব যেসব সংস্কার প্রস্তাব এসেছে সেগুলো ঘষা-মাজার মধ্য দিয়ে চূড়ান্ত করে নির্বাচন অনুষ্ঠানের আয়োজন করা উচিত।

অন্তর্বর্তী সরকার সাংবিধানিক কোনো সংস্কার করতে পারবে না। তারা সংবিধানের পাশ দিয়ে হেঁটে চলছে। সরকারের একমাত্র সাংবিধানিক ভিত্তি হচ্ছে, সংবিধানের ১০৬ অনুচ্ছেদ। যেখানে সুপ্রিম কোর্টের উপদেশমূলক পরামর্শ দেওয়ার ক্ষমতা আছে। সুতরাং অন্তর্বর্তী সরকার সুপ্রিম কোর্টের উপদেশ অনুযায়ী পরিচালিত হচ্ছে। এ ছাড়া এই সরকারের আইনগত আর কোনো ভিত্তি নেই। তাই অন্তর্বর্তী সরকার যত দ্রুত নির্বাচনের দিকে হাঁটবে তত দ্রুত জনগণের প্রত্যাশা পূরণ করতে পারবে।

বেগম খালেদা জিয়া এবং তারেক রহমানের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলাগুলো এখন কোন পর্যায়ে আছে?

কাজল: এই দুজন ছাড়াও হাসিনার আমলে বিএনপির প্রায় ৫০ লাখ নেতা-কর্মীর বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দেওয়া হয়েছে। গ্রাম থেকে শুরু করে ওয়ার্ড পর্যায়ের নেতা-কর্মীরাও মিথ্যা মামলার খড়গ থেকে বাঁচতে পারেননি। বেগম খালেদা জিয়া এবং তারেক রহমান ছিলেন শেখ হাসিনার প্রধান প্রতিপক্ষ। এখন একের পর এক এসব মামলা থেকে তারা খালাস পাচ্ছেন। এতে প্রমাণ হয় যে, সবকটি মামলাই ছিল রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।

রাজনৈতিক অঙ্গনে বেগম খালেদা জিয়া এবং তারেক রহমানের বিরুদ্ধে ‘মাইনাস টু’র আলোচনা চলছে।

কাজল: এক-এগারোর অনির্বাচিত সরকারের সময়কার অগণতান্ত্রিক এবং বিরাজনীতিমূলক ‘মাইনাস টু’ এর স্মৃতি জনগণের মনে এখনো জাগরূক রয়েছে। অসাংবিধানিক, কূটকৌশলপূর্ণ এমন কোনো পরিকল্পনা এখনো যদি কারও মধ্যে তৈরি হয় তবে জনগণ তা বাস্তবায়িত হতে দেবে না।

তারেক রহমান বারবার বলছেন, আগামী নির্বাচন হবে বিএনপির জন্য অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং। চ্যালেঞ্জের জায়গাগুলো কী কী?

কাজল: বর্তমানে দেশের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক দল বিএনপি। মানুষ মনে করে, এখন নির্বাচন হলে বিএনপি একচ্ছত্রভাবে জয়ী হয়ে ক্ষমতায় আসবে। বিএনপির এ রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ যাদের কাছে আশঙ্কার কারণ কিংবা বিএনপির এ সাফল্যে যারা ভাগ বসাতে চায় তারা স্বাভাবিকভাবেই বিএনপির এ গতিধারাকে রুদ্ধ করার চেষ্টা করবে। এ জন্য তারেক রহমান তার নেতা-কর্মীদের সতর্ক করার জন্য চ্যালেঞ্জের কথা বলেছেন।

আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের জন্য বিএনপির প্রস্তুতি কেমন?

কাজল: বিএনপি জনমানুষ এবং গণমানুষের রাজনৈতিক দল। বিএনপির সাংগঠনিক ভিত্তি তৃণমূল পর্যায় পর্যন্ত বিস্তৃত। বিএনপির রাজনৈতিক শক্তির বাইরে সবচেয়ে বড় শক্তি শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের ব্যক্তিগত সততা, তার ও বেগম খালেদা জিয়ার প্রতি মানুষের শ্রদ্ধা এবং তারেক রহমানের প্রতি দলের সর্বস্তরের নেতা-কর্মীর আস্থা। তাদের প্রতি দলের এবং দেশের মানুষের আস্থায় বলীয়ান বিএনপি যে কোনো সময় নির্বাচনের জন্য প্রস্তুত। যদি প্রস্তুতি না থাকত তবে বিএনপি প্রতিনিয়ত নির্বাচনের কথা বলত না। যে ক