,

চাঁদপুরে ৬ শতাধিক শিক্ষকের পদ শূন্য রেখেই চলছে প্রাথমিকের শিক্ষা কার্যক্রম

আজকের কুমিল্লা ডট কম :
October 19, 2024
news-image

চাঁদপুরে ৬ শতাধিক শিক্ষকের পদ শূন্য রেখেই চলছে প্রাথমিকের শিক্ষা কার্যক্রম

মাসুদ হোসেন, চাঁদপুরঃ

চাঁদপুর জেলার ২৮৯ প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নেই প্রধান শিক্ষক। চলছে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক দিয়ে। এছাড়া ৩৩০ জন সহকারী শিক্ষকের পদও শূন্য রয়েছে। প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য থাকায় অভিভাবকহীন হয়ে পড়েছে চাঁদপুরের ২৮৯ টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। দীর্ঘদিন ধরে প্রধান শিক্ষক পদে নিয়োগ ও পদোন্নতি না দেয়ায় এবং অবসরের কারণে এই অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে বলে জানা যায়। তবে সিনিয়র শিক্ষকদের মধ্য থেকে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে উক্ত স্কুলগুলোতে। এতে ব্যাহত হচ্ছে বিদ্যালয়ের নিয়মিত পাঠদানসহ প্রশাসনিক কার্যক্রম। নিয়মিত প্রধান শিক্ষক না থাকায় অনেক দাপ্তরিক কাজে ব্যাঘাত সৃষ্টি ও জটিলতা তৈরি হচ্ছে।

শিক্ষার্থীদের পাঠদানের সুষ্ঠু পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে ও দায়িত্বহীনতা এড়াতে জরুরী ভিত্তিতে এসব বিদ্যালয়গুলোতে প্রধান শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করেন অভিভাবক মহল। পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের মানসম্পন্ন শিক্ষা ও পাঠদানে সমস্যা তৈরি হচ্ছে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা। অভিভাবকরা বলছেন, মানসম্পন্ন শিক্ষার পূর্ব শর্ত হলো- প্রয়োজনীয় শিক্ষক, পর্যাপ্ত শ্রেণিকক্ষ ও উপযুক্ত পরিবেশ। এসবের কোনো একটির কম হলে মানসম্পন্ন শিক্ষায় সংকট দেখা দেয়। বিশেষ করে শিক্ষার্থী অনুপাতে শিক্ষক না থাকলে পাঠদানে সমস্যা সৃষ্টি হয়।

চাঁদপুর জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা যায়, চাঁদপুর জেলার ৮ উপজেলার ১১৫৬ টি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে। এর মধ্যে ২৮৯ টি বিদ্যালয়ে নেই প্রধান শিক্ষক। জেলায় প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বর্তমানে মোট শিক্ষক রয়েছে ৮ হাজার ১৩০ জন, ছাত্র-ছাত্রী অধ্যয়নরত আছে ৩ লক্ষ ১২ হাজার ৩৫০ জন। ক্লাস্টার রয়েছে ৪৬ টি, সাব- ক্লাস্টার ২২৫টি, ভর্তির হার ৯৯.৯৮% ও ঝরে পড়ার হার ৮.৭৩%।

এদিকে সহকারি শিক্ষকের ৩৩০ টি পদ শূন্য নিয়েই চলছে জেলার প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থা। অন্যদিকে শিক্ষা অফিসগুলোতে প্রায় ৫৫ টি পদ শূন্য রয়েছে। শূন্য পদের মধ্যে উচ্চমান সহকারী, নিম্নমান সহকারী,

অফিস সহকারী কাম মুদ্রাক্ষরিক, অফিস সহায়ক সহ বিভিন্ন পদে ৫৫ টি পদে জনবল শূন্য রয়েছে। এসব পদে নতুন প্রধান শিক্ষক নিয়োগের প্রক্রিয়া চলছে। শূন্য পদে প্রধান শিক্ষক পদায়ন হবে পদোন্নতি ও সরাসরি নিয়োগের মাধ্যমে। পদোন্নতির মাধ্যমেই বেশি নিয়োগ হবে। বছরে জেলার প্রতি বিদ্যালয়ে সর্বনিম্ন ৫০হাজার এবং উর্ধ্বে ৭০হাজার দৈনন্দিন খরচ করার জন্য বরাদ্দ দেয়া হয়। স্কুল বুঝে বরাদ্দ দেয়া হয়। এ বরাদ্দে মূলত চক, ডাস্টার, খেলাধুলাসহ বিভিন্ন অফিসিয়াল আনুসাঙ্গিক খরচ করা হয়। যা স্লিপের মাধ্যমে দেয়া হয়। এই ক্ষেত্রে অভিযোগ আছে কিছু স্কুলে এই বরাদ্দ পুরোপুরি খরচ করা হয় না।

এদিকে শিক্ষক সংকটের কারণে জেলার ফরিদগঞ্জ উপজেলার পাইকপাড়া ইউনিয়নের পূর্ব ভাওয়াল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় চলছে একজন শিক্ষক দিয়ে। এতে চরমভাবে পড়ালেখায় বিঘ্ন ঘটছে বিদ্যালয়টির ছাত্র-ছাত্রীদের। বর্তমানে এ স্কুলের শিক্ষার্থীর সংখ্যা ১০৮জন। দুই শিফটে ৬শ্রেণির নিয়মিত ১০০থেকে ১০৫ জন শিক্ষার্থীর উপস্থিতি থাকলেও বিদ্যালয়টিতে শিক্ষক রয়েছেন একজন। যার ফলে ব্যাহত হচ্ছে পাঠদান ব্যবস্থা। এ বিদ্যালয়ে মাত্র ৪ জন শিক্ষকের মধ্যে দু’জনের অবসরগ্রহণ এবং একজন ছুটিতে থাকায় তৈরি হয়েছে এমন পরিস্থিতি।

বিদ্যালয় শিক্ষক ও স্থানীয়দের সাথে কথা বলে জানা গেছে, শিক্ষক সংকটে থাকা এই বিদ্যালয়টিতে ৭ জন শিক্ষক থাকার কথা থাকলেও ৪ জন দিয়ে চলছে বিদ্যালয়ের পাঠদান। এ স্কুলের প্রধান শিক্ষক শান্তি রানী ধর অবসরে গেলে ৩ শিক্ষক মিলে বিদ্যালয়ের পাঠদান চালান। এ তিনজনের মধ্যে নুরুন্নাহার নামে একজন ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনিও গত ৩ মাস পূর্বে মারা যান। দুইজন সহকারি শিক্ষক মিলে বিদ্যালয়টির হাল ধরলেও তানিয়া আক্তার নামের একজন শিক্ষিকা শারীরিক অসুস্থতা জনিত কারণে অবসরে চলে যান। যার ফলে বিদ্যালয়টিতে শিক্ষকের সংখ্যা দাঁড়ায় একজন।

বর্তমানে দায়িত্বে থাকা সহকারী শিক্ষক ফাতেমা আক্তার শিক্ষার্থীদের পাঠদান করাতে গিয়ে হিমশিম খান। তিনি বলেন, এমন প্রেক্ষাপটে একজন অস্থায়ী শিক্ষককে আনা হয়। শিক্ষক না থাকায় সকালে প্রাক-প্রাথমিক, প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থীদের একসঙ্গে ক্লাস শুরু করেন। পর্যায়ক্রমে অস্থায়ী শিক্ষকের সহযোগিতায় সব কটি শ্রেণিকক্ষে পাঠদান করাতে হয় তাদের। স্থানীয় বাসিন্দা রাশেদুল ইসলাম বলেন, অভিভাবকের সহায়তায় শিক্ষার্থীরা নিয়মিত বিদ্যালয়ে আসলেও বিদ্যালয়টিতে শিক্ষক না থাকায় শিশুদের প্রাথমিক শিক্ষা নিয়ে হতাশা দেখা দিয়েছে। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের গুরুত্বসহকারে নজর দেয়া জরুরি।

এ নিয়ে ফরিদগঞ্জ উপজেলা সহকারী প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মাহাবুব আলম বলেন, বিদ্যালয়টির মাত্র একজন শিক্ষক রয়েছে সত্য। তবে এমন পরিস্থিতিতে একজন অস্থায়ী শিক্ষককে আনা হয়। বিদ্যালয়টিতে শিক্ষক দিতে উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সাথে যোগাযোগ করা হবে। এই বিষয়ে ফরিদগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মৌলি মন্ডল বলেন, বিদ্যালয়টির শিক্ষক সংকট আমার জানা ছিল না। আমি সংশ্লিষ্টদের সাথে কথা বলে ওই বিদ্যালয়ে শিক্ষক দেয়ার ব্যবস্থা করব।

অন্যদিকে সাম্প্রতিক কালের বন্যায় জেলার ১৬৯টি প্রাথমিক বিদ্যালয় ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এতে ১ কোটি ৬ লক্ষ ২৫ হাজার টাকার ক্ষতি হয়। যা কাটিয়ে উঠতে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস তাদের উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছেন। ইতিমধ্যে অনেক স্কুল মেরামত কাজ সম্পন্ন করেছেন। অনেক গুলোতে কাজ চলছে বলে জানা যায়।

চাঁদপুর জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার ফাতেমা মেহের ইয়াসমিন জানান, প্রধান শিক্ষক ও সহকারী শিক্ষক সহ জনবল সংকট রয়েছে। সহকারী শিক্ষক পদে শূন্য রয়েছে ৩৩০ জন। সহকারী শিক্ষক পদে নিয়োগ হবে এবং প্রধান শিক্ষক পদে প্রমোশন হবে বলে জানান। উচ্চমান সহকারী, অফিস সহকারী পদে নিয়োগ হবে। পদোন্নতি কার্যক্রমের মাধ্যমে প্রধান শিক্ষকের পদ পূরণ হলে প্রাথমিক শিক্ষা আরও বেগবান হবে বলে তিনি জানিয়েছেন।