সুলেখা আক্তার শান্তা:
প্রেম ভালবাসা বুঝার মতো বয়স হয়নি রিতার। কিন্তু তারপরও হৃদয়তার মায়ায় ভরা থাকে আবিরের জন্য। ছোট্ট রিতা ক্লাস ফাইভে পড়ে আর আবির ক্লাস নাইনে। ক্লাস সহপাঠী না হলেও একই স্কুলে পড়ে দু’জন। আবিরের প্রতি বিশেষ আগ্রহের কোন কারণ খুঁজে পায় না তার ক্ষুদ্র বুদ্ধি। ক্লাসের ফাঁকে ফাঁকে আড়াল থেকে দেখে আবিরকে। স্কুল বা খেলার মাঠে যেখানেই আবির সেখানেই রিতা হাজির। রিতা চায় যেকোনো খেলায় আবির জয়ী হোক। আবির যে খেলাতে অংশ নেয় প্রায় খেলাতেই জয়ী হয়। একদিন খেলায় আবির জয়ী হলে চারিদিকে তুমুল হাততালি শুরু হয়। রিতারও হাতে তালি আর মুখে হাসি। এই প্রাণবন্ত উচ্ছ্বাস থামেই না রিতার। আশেপাশের সবাই তাকায় রিতার দিকে। আবির বিষয়টি লক্ষ্য করে। সে রিতার কাছে এসে বলে, এবার তালিটা থামাও। তখনই রিতা লাজুক ভাবে হাসি দিয়ে হাতে তালি থামায়। বাহ তোমার মুক্তঝরা হাসি দেখে মন ভরে গেল। রিতা আরো লজ্জা পেয়ে যায়। আবির আরো বলে, তোমার মুক্তঝরা হাসি থামিও না। রিতা যেন আরো লজ্জা পেয়ে যায়।
রিতা খালার বাড়ি বেড়াতে যায়। সেখানে দেখে খালাতো ভাই সজীবের সঙ্গে সোফায় বসে আছে আবির। আবিরকে দেখে দরজার আড়ালে চলে যায় রিতা। একটু পর পর উঁকি দিয়ে দেখত থাকে আবিরকে। আবির তাকাতেই হাসি দিয়ে আড়ালে চলে যায়। আবিরের এমনটা দেখে ভালোই লাগে। আবির ভালোবাসে রিতার মেজো খালা মেয়ে সানজানাকে। সানজানা ও প্রায়ই বেড়াতে আসে খালা কহিনূরের বাড়িতে। আবির আর সজীব তেমন ঘনিষ্ঠ বন্ধু নয়। সানজানার কারণেই আবির সজীবের সঙ্গে বেশি ঘনিষ্ট হয়। সজীব ব্যাপারটা একটু অনুমান করতে পারলেও বন্ধুত্ব কারণে আবিরকে কিছু বলে না। আবিরও একসময় খুলে বলে সানজানাকে সে ভালোবাসে। কৈশোর প্রেমের বাস্তবতাকে অস্বীকার করা যায় না। সজীব তখন গুরুজনের মতো উপদেশ দেয় আবিরকে। ভালোবাসো ঠিক আছে পড়ালেখা শেষ করো। চাকরি, ব্যবসা কিছু একটা করো তারপরে বোনকে তোমার হাতে তুলে দেব। তার আগে কিন্তু বিয়ের কথা বলোনা। এমন ভাই থাকতে বোনের আর চিন্তা কি আবির বলে। আমাকে কেমন অগ্রিম শর্ত দিয়ে আটকে রাখলে। বোন আর ভগ্নিপতি উভয়ের মঙ্গলের জন্য এই চাওয়া।
রিতা আর সানজানা খালা কহিনূরের বাড়ির ছাদে উঠে কথায় মেতে আছে। আবির ইশারায় সানজানাকে ডাকে কিন্তু সে লক্ষ্য করে না।আবির এবার রিতাকে ইশারা করে। রিতা ব্যাপারটি লক্ষ্য করে ছাদ থেকে নেমে আসে। আবির একটা চিঠি রিতার হাতে দিয়ে বলে, চিঠিটি তোমার সানজানা আপুকে দিও। রিতা চিঠিটা নিয়ে ছাদে যায়। আপু তোমার চিঠি আবির ভাইয়া দিয়েছে। সানজানা ভ্রূকুঞ্চিত হাসি দিয়ে চিঠিটা হাতে নেয়। বলে, ভালোই হলো রে তোকে দিয়ে আবিরের কাছে চিঠি দেওয়া যাবে। রিতা বয়সে ছোট। প্রেম, ভালোবাসার পর্যায় গুলো এখনো তার কাছে পরিষ্কার নয়। সানজানা আপুকে আবিরের চিঠি দেওয়া দেখে তার মধ্যে আগের মত উচ্ছ্বাসে ভাটা পরে। আবির আর সানজানা তাদের কয়েকটা চিঠি দেওয়া নেওয়া করে রিতাকে দিয়ে। রিতাকে এক অকারণ মনঃক্ষুণ্য অনুভূতি ঘিরে ধরে। আবিরকে এখন আর আগের সেই উচ্ছ্বাস নিয়ে চোখে চোখে রাখেনা। আবির কোন খেলায় অংশগ্রহণ করলেও সেখানে রিতা হাজির হয় না। আবিরএসএসসি পাস করে পরিবারের সঙ্গে ঢাকায় চলে যায়। সেখানেই চলে তার পড়ালেখা। সানজানা সঙ্গে পত্রবিনিময় নিয়মিত চলতে থাকে।রিতার সঙ্গে আবিরের আর দেখা কিংবা কোন যোগাযোগ হয় না।
কোহিনুরের স্বামী আতিক চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন। আসন্ন একটি ছবির মহরত উপলক্ষে বাসায় এক অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছেন। সেই অনুষ্ঠানে চলচ্চিত্র বাইরেও পারিবারিক আত্মীয়-স্বজন অনেকেই এসেছেন। আবির এবং সানজানাও এসেছে। অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত অতিথিরা একে অপরের সঙ্গে কুশল বিনিময় করে।
রিতা এসেছে তার স্বামী অনিককে নিয়ে। আবির রিতাকে দেখে বলে, কেমন আছো রিতা?
ভালো।
আপনি?
ভালো।
ও পরিচয় করিয়ে দেই, আমার হাজব্যান্ড অনিক।
ও আচ্ছা, তুমি এই ছোট্ট বয়সে বিয়ে করে ফেলেছ!
হ্যাঁ, মেয়ের জন্য ভালো বর পেয়ে বাবা মা মেয়েকে বিয়ে দিয়ে দিলেন।আবির দেখে রিতা অনেক ভালো বর পেয়েছে। আবির আর অনিক দুজনে হ্যান্ডশেক করে। দুজনের মধ্যে আলাপচারিতা ভালোই জমে ওঠে।
আবির আর সানজানার ভালোবাসার কথা দুই পরিবারের মধ্যে কমবেশি অনেকেই জানে। কিন্তু সানজানার বাবা মোতাহার হোসেন এই ভালোবাসা মানেন না। তিনি মেয়েকে বিয়ে দিবেন দেখেশুনে তার পছন্দমতো ছেলের সঙ্গে। তিনি তাই করেন, কারো কোন কথায় কর্ণপাত নাকরে। সুপাত্র দেখে মেয়েকে অন্যত্র বিয়ে দিয়ে দেন। আবিরের সঙ্গে সানজানার আর কোন যোগাযোগ থাকে না।
বহু বছর পর। হঠাৎ আবিরের সামনে একটি ফেসবুক আইডি ভেসে আসে, রিতা আহমেদ অনিক। আবির ওই আইডিতে ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠায়। আবির নাম দেখে রিতা একটু চমকে যায়। সে ফেসবুক আইডিটি একসেপ্ট করে। আবির ধন্যবাদ জানায়, রিকোয়েস্ট একসেপ্ট করার জন্য। প্রশ্ন করে, তুমি আমাকে চিনেছো? আমি আবির।
হ্যাঁ।
কিভাবে চিনলে?
চিনলাম। এই যে আবির নাম।
আবির নামে তো কত ফেসবুক আইডি আছে।
হ্যাঁ আছে। আমার মনে হলো আমি যে আবিরকে চিনতাম এ সেই আবির।
সে কোন আবির?
আমি যে আবিরকে স্কুলে চিনতাম।
তোমার মনে আছে! এটা জেনে খুবই ভালো লাগলো। তুমি আমাকে মনে রেখেছো। তুমি আমাকে দেখলে হাসতে আবার আড়ালে চলে যেতে। আমার এটা মনে পড়তো।
ও আচ্ছা।
কেমন আছো তুমি?
ভালো।
আপনি কেমন আছেন?
ভালো। রিতা তোমার সঙ্গে আমি কথা বলছি কোন সমস্যা নেই তো?
না।
সমস্যা থাকলে বলো।
আমার দিক থেকে সমস্যা নেই। আপনার দিক থেকে সমস্যা আছেকিনা সেটা দেখেন।
না নেই।
রিতা জানো, তোমার আইডিটি দেখেই আমি চিনেছিলাম যে এটা তুমিই।
এত কনফিডেন্স কিভাবে আসলো।
তোমার ছবি দেখলাম সঙ্গে তোমার হাজব্যান্ড। তারপর তোমার পরিবারের। বিশেষ করে তোমার খালুর ছবিটা তোমার প্রোফাইলে দেখে আরো শিওর হলাম, তুমি রিতা।
ও আচ্ছা। বুঝতে পেরেছি।
আবির আর রিতার মধ্যে মেসেঞ্জারে চ্যাটিং চলতে থাকে। আবির জানতে চায় রিতার ছেলে মেয়ের কথা। রিতা প্রতি উত্তরে বলে, বিয়ের বেশ কয়েক বছর পর আমার একটি মেয়ে হয় সে এখন অনার্সে পড়ে।
ও আমার ছেলে তো পড়ালেখা শেষ করেছে। এখন ছেলের বিয়ের জন্য মেয়ে দেখছি। আবির রিতার প্রোফাইল থেকে একটি ছবি নিয়ে রিতার মেসেঞ্জারে দেয়। জিজ্ঞেস করে, এটি তোমার মেয়ে।
হ্যাঁ, আমার মেয়ে অহনা।
আমি বুঝতে পেরেছি যে তোমার মেয়ে। রিতা আমার ছেলে নিরবের জন্য তোমার মেয়েকে আনতে চাই কি বলো তুমি?
ও আচ্ছা ভালো কথা।
তোমার সঙ্গে অনেকদিন দেখা হয়নি। চলো একদিন দুজনের ছেলে মেয়ে নিয়ে দেখা করি কোন রেস্টুরেন্টে। ছেলে মেয়েজ্ঞ দুজন দুজনকে দেখুক।ওদের যদি ভালো লাগে আমরা বিয়ের কথা পাকাপাকি করব।
ঠিক আছে। আবির তার ছেলে নিরবকে নিয়ে রিতা তার মেয়ে অহনাকেনিয়ে রেস্টুরেন্টে হাজির হয়। রেস্টুরেন্টে খাওয়া দাওয়া আলাপচারিতায়সৃষ্টি হয় আন্তরিক পরিবেশ। নিরব আর অহনাকে আলাদাভাবেআলাপ করতে দেয়া হয়। নিরব আর অহনা একে অপরকে বুঝতে চেষ্টাকরে। প্রাথমিক আলাপে উভয়েই সন্তুষ্ট। দুজনই ভাবে তাদের বাবা-মাতাদের পারফেক্ট মনের মানুষ সঙ্গে পরিচà