পরিবার থেকেই সন্তানদের নৈতিক শিক্ষা দিতে হবে: চাঁদপুর জেলা প্রশাসক
মাসুদ হোসেন, চাঁদপুরঃ
চাঁদপুর জেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির মাসিক সভা রোববার (১৩ সেপ্টেম্বর) সকাল ১০টায় জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সম্মেলন কক্ষে এ সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। সভায় সভাপতিত্ব করেন চাঁদপুরের জেলা প্রশাসক ও বিজ্ঞ জেলা ম্যাজিস্ট্রেট আহমেদ জিয়াউর রহমান। সভাপতির বক্তব্যে চাঁদপুর জেলা প্রশাসক আহমেদ জিয়াউর রহমান বলেন, “চাঁদপুর জেলার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক ও নিয়ন্ত্রণে রাখতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় সব ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। পৌরসভার উদ্যোগে ও অর্থায়নে গুরুত্বপূর্ণ শহরের ১৯টি স্থানে ইতোমধ্যে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। নিষিদ্ধ সংগঠনের কোনো ধরনের কার্যক্রম যাতে পরিচালিত হতে না পারে, সে বিষয়ে প্রশাসন সর্বোচ্চ সতর্ক রয়েছে।”
তিনি বলেন, “মাদকের বিরুদ্ধে আমাদের অবস্থান অত্যন্ত কঠোর। মাদক ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান পরিচালনার পাশাপাশি মাদকসেবীদের পুনর্বাসন ও প্রশিক্ষণের বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে দেখতে হবে। চিকিৎসার জন্য সদর হাসপাতালে ইউনিট চালু করার চিন্তা চলছে। কারাগারে থাকা মাদক ব্যবসায়ী ও মাদকসেবীদের জন্য প্রশিক্ষণের সুযোগ আরও বাড়ানোর উদ্যোগ নিতে হবে।” মাদক ও কিশোর গ্যাংসহ বিভিন্ন অপরাধ প্রতিরোধে পরিবার ও সমাজের ভূমিকার ওপর গুরুত্বারোপ করে জেলা প্রশাসক বলেন, “সন্তানরা কখন ঘুম থেকে উঠছে, কখন ঘুমাতে যাচ্ছে এবং সারাদিন কী করছে— এসব বিষয়ে অভিভাবকদের নজরদারি বাড়াতে হবে। পরিবার থেকেই সন্তানদের নৈতিক শিক্ষা দিতে হবে। সংস্কৃতি চর্চা ও ধর্মীয় অনুশাসনের মাধ্যমে তরুণদের অপরাধপ্রবণতা অনেকাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব।”
জনসচেতনতা বৃদ্ধির বিষয়ে তিনি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের প্রতি, প্রতি শুক্রবার বিভিন্ন মসজিদে গিয়ে মাদক, বিদ্যুৎ, জননিরাপত্তা ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে মুসল্লিদের সচেতন করার আহ্বান জানান। বাজার মনিটরিং ও পরিবেশ সুরক্ষার বিষয়ে তিনি বলেন, “অবৈধ ইটভাটা কোনোভাবেই চলতে দেওয়া হবে না। প্রয়োজনীয় লাইসেন্স ছাড়া কোনো ইটভাটায় কার্যক্রম পরিচালনা করা যাবে না। ইটভাটায় খালের মাটি ব্যবহার বন্ধ করতে হবে। একই সঙ্গে অবৈধ পলিথিনের ব্যবহার বন্ধ, ভেজাল খাদ্য প্রতিরোধ এবং নিয়মিত মোবাইল কোর্ট পরিচালনার মাধ্যমে আইন অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে।”
ইলিশ রক্ষায় সরকারি নিষেধাজ্ঞা যথাযথভাবে বাস্তবায়ন এবং অবৈধ জাল ব্যবহার বন্ধে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোকে আরও সক্রিয় হওয়ার নির্দেশ দেন তিনি।চাঁদপুরের মিনি কক্সবাজার এলাকায় নদীতে চলাচলকারী ট্রলার থেকে একটি কুচক্রী মহল চাঁদা আদায় করছে—এমন তথ্য প্রশাসনের কাছে এসেছে উল্লেখ করে জেলা প্রশাসক বলেন, “বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে নিয়ে খুব শিগগিরই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। নদীপথে কোনো ধরনের চাঁদাবাজি বা হয়রানি বরদাশত করা হবে না।” জেলা প্রশাসক জেলার সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে জেলা পুলিশ, নৌ-পুলিশ ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরকে আরও সক্রিয় হওয়ার তাগিদ দেন। একই সঙ্গে গ্রাম আদালতের কার্যক্রম আরও কার্যকর করা এবং নিয়মিত আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি পর্যালোচনার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
সভায় বক্তব্য রাখেন চাঁদপুরের পুলিশ সুপার মো. মিজানুর রহমান। পুলিশ সুপার বলেন, “চাঁদপুরে কিশোর গ্যাংয়ের কার্যক্রম আমরা কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আনতে পেরেছি। মাদকের বিরুদ্ধে জেলা পুলিশের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। মাদকসেবীদের কীভাবে পুনর্বাসন করা যায়, সে বিষয়েও আমরা কাজ করছি। কারাগারে থাকা মাদকসেবী বন্দিদের প্রশিক্ষণের আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হবে।” অবৈধ যানবাহনের বিরুদ্ধে অভিযান প্রসঙ্গে পুলিশ সুপার বলেন, “আমরা অবৈধ যানবাহনের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করেছি। অটোরিকশা আটক করা হলে অনেকেই শুধু পৌরসভার লাইসেন্স দেখান। আমার মনে হয় না, চাঁদপুর পৌরসভা এত বিপুলসংখ্যক লাইসেন্স দিয়েছে। জনদুর্ভোগ সৃষ্টি হয়— এমন কোনো কার্যক্রম করতে দেওয়া যাবে না।”
সভায় চাঁদপুর প্রেস ক্লাবের সভাপতি সোহেল রুশদী বলেন, অপরাধপ্রবণতা কমাতে জেলার গুরুত্বপূর্ণ ও অপরাধপ্রবণ স্পটগুলোকে পর্যায়ক্রমে সিসিটিভি ক্যামেরার আওতায় আনা প্রয়োজন। সিসিটিভি স্থাপন কার্যক্রমকে মডেল হিসেবে নিয়ে এর তদারকির দায়িত্ব জেলা পুলিশকে দেওয়া যেতে পারে। তিনি বলেন, মাদকসেবী ও মাদক বিক্রেতাদের পুনর্বাসন ও চিকিৎসার জন্য চাঁদপুর সদর হাসপাতালে একটি বিশেষায়িত চিকিৎসা ইউনিট স্থাপন করা যেতে পারে। মাদক নিয়ন্ত্রণে ডিবি পুলিশের তৎপরতা আরও বাড়ানোর প্রয়োজন রয়েছে।সোহেল রুশদী আরও বলেন, “চাঁদপুরে মাদক প্রবেশের প্রধান তিনটি পথ হলো সড়ক, রেল ও নৌপথ। এসব রুটে নিয়মিত অভিযান ও চেকিং জোরদার করা হলে মাদক প্রবেশ অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে।”
চাঁদপুরের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট উজালা রানী চাকমার পরিচালনায় সভায় জেলার বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তা ও প্রতিনিধিগণ বক্তব্য রাখেন।