,

করোনা: নামেই পিপিই, বাস্তবে রেইনকোট

আজকের কুমিল্লা ডট কম :
March 30, 2020
news-image

 

ডেস্ক রিপোর্টঃ

করোনায় সুরক্ষা যারা দেবে, সেই চিকিৎসকরদের সুরক্ষা এখন সবচেয়ে জরুরি। আর তােই তাদের সুরক্ষা সরঞ্জাম পিপিই নিয়ে এখন বেশি উদ্বিগ্ন সবাই। করোনা ভাইরাস কোভিড-১৯ আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসাসেবায় নিয়োজিত চিকিৎসক, নার্সসহ সংশ্লিষ্টদের পরিধান করতে হবে এক ধরনের বিশেষ নিরাপত্তা পোশাক— যা পিপিই (পারসোনাল প্রটেকটিভ ইকুইপমেন্ট) নামে পরিচিত। দেশে করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব শুরুর পর থেকে একাধিক ব্যক্তি, সামাজিক সংগঠন পিপিই তৈরি করছে। কেউ করছে বাণিজ্যিক কারণে, আবার কেউ স্বেচ্ছায় সহযোগিতা করার জন্য, কেউবা আবার সরকারের শীর্ষপর্যায়ের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য। মেডিকেল গ্রেডের পিপিই উৎপাদনে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশনা অনুসারে যেখানে অনেক রকম নিয়ম মানতে হয়, সেখানে অনেক প্রতিষ্ঠান ও সংগঠন অস্বাভাবিক দ্রুততায় কিভাবে ‘পিপিই’ তৈরি করে বিতরণ ও সরবরাহ করছে— এটা সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের কাছে বিস্ময়ের সৃষ্টি করেছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, ‘পিপিই’ এর নামে যা তৈরি হচ্ছে, তার প্রায় সবই মূলত রেইনকোট ধরনের ওয়াটার প্রুফ জ্যাকেট গাউন। বিপদটাও সেখানেই। নিয়ম না মেনে উপযুক্ত কাপড় ছাড়া ভিন্ন কাপড়ে তৈরি করা পিপিই যারা ব্যবহার করবেন তাতে তাদের সুরক্ষা নিশ্চিত তো দূরের, উল্টো তাদের বিপদের মুখে ফেলে দেবে এবং অনায়াসে করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ ঘটাতে সহায়তা করবে।

সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সঠিক ও সুরক্ষিত পিপিই হতে হবে রাসায়নিক দ্রব্যের ক্ষতিকর প্রতিক্রিয়া প্রতিরোধযোগ্য (কেমিক্যাল হ্যাজার্ড প্রিভেন্টেবল)। এছাড়া এই পিপিই যেকোনো ফেব্রিকস (কাপড়) দিয়ে বানানো যায় না। ওষুধ প্রশাসন বা স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অনুমোদিত ফেব্রিক্সেই বানাতে হবে। ইতিমধ্যেই ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর পলিয়েস্টার ১৯০টি ( polyester 190T) নামের ফেব্রিক্সকে পিপিই বানাতে অনুমোদন দিয়েছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশিত পোশাক নীতিমালাতে বলা হয়েছে, পিপিই হচ্ছে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ থেকে মুক্ত থেকে চিকিৎসাসেবা দেওয়ার বিশেষ পোশাক। এই পোশাক হওয়া প্রয়োজন তিন স্তরের— ভাইরাস-ব্যাকটেরিয়া প্রতিরোধী এবং স্বাভাবিক শ্বাস-প্রশ্বাসের উপযোগী। এই পোশাকে থাকবে কম্বো পিপিই- কাভারঅল, হেড মাস্ক, মেডিক্যাল মাস্ক, গগলস, বুট এবং সু-কাভার। এসব পোশাক হবে ডিসপোজেবল (একবার পরার পর ফেলে দিতে হবে)।

পিপিই তৈরিতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বাইরে ইউরোপিয়ান স্ট্যান্ডার্ড, আমেরিকান স্ট্যান্ডার্ড এবং সাম্প্রতিক সময়ে চীনেও একটি স্ট্যান্ডার্ড তৈরি করা হয়েছে। চিকিৎসক, রোগীর কক্ষে থাকা স্বাস্থ্যসেবা কর্মী, পরিচ্ছন্নতা কর্মী, মেডিক্যাল টেকনোলজিস্টসহ প্রতিটি স্তরের পেশাজীবীদের জন্য পৃথক পৃথক পিপিইর কথা বলা হয়েছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, ‘পিপিই’ এর নামে বর্তমানে বাংলাদেশে যা তৈরি হচ্ছে, তার অধিকাংশই মূলত রেইনকোট ধরনের ওয়াটার প্রুফ জ্যাকেট গাউন। বিপদটাও সেখানেই। নিয়ম না মেনে উপযুক্ত কাপড় ছাড়া ভিন্ন কাপড়ে তৈরি করা পিপিই যারা ব্যবহার করবেন তাতে তাদের সুরক্ষা নিশ্চিত তো দূরের, উল্টো তাদের বিপদের মুখে ফেলে দেবে এবং অনায়াসে করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ ঘটাতে সহায়তা করবে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা নির্দেশিত তিন স্ট্যান্ডার্ডের ক্রাইটেরিয়া (মানদণ্ড) পূর্ণ হলেই কেবলমাত্র একটি পারফেক্ট (পরিপূর্ণ) পিপিই তৈরি করা সম্ভব। এ মুহূর্তে ‘পিপিই’ সবকিছুর চেয়ে আলাদা কেন সেটাও বুঝতে হবে। কারণ ‘পিপিই’ ভাইরাস সংক্রমণ ঠেকাতে কার্যকর ভূমিকা রাখবে, যা অন্য সাধারণ কাপড় বা রেইনকোটে হবে না। বরং ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াবে।

জানা গেছে, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার স্ট্যান্ডার্ড মেইনটেইন না হওয়ার কারণে বিশ্বখ্যাত এক প্রতিষ্ঠানের বিপুলসংখ্যক ‘পিপিই’ বাতিল করে দিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, স্মার্ট জ্যাকেট লিমিটেড মূলত যুক্তরাষ্ট্রের ক্রেতা প্রতিষ্ঠান উডব্রিজের জন্য পাঁচ বছর ধরে এক ধরনের পিপিই তৈরি করছে— যা মূলত নায়াগ্রা জলপ্রপাত দেখতে যাওয়া পর্যটকরা ব্যবহার করে থাকে। তাদের এই পিপিই তৈরির বুকিং ২০২৩ সাল পর্যন্ত। কিন্তু স্বাস্থ্যকর্মীদের সুরক্ষার জন্য বিশ্বমানের পিপিই (ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জাম) তৈরিতে এফডিএ এবং সিই সার্টিফিকেশন প্রয়োজন। অথচ এসব সার্টিফিকেশন ছাড়াই অনেকটাই রেইনকোটের কাপড়ে ‘পিপিই’ বানাচ্ছে স্মার্ট জ্যাকেট লিমিটেড।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘তৈরিকৃত পিপিইর তিনটি স্তরে শার্ট, প্যান্ট এবং চশমায় একটি বালির সমপরিমাণও ছিদ্র থাকতে পারবে না। অথচ কেউ কেউ ছাতা বানানোর কাপড় দিয়েও বানাচ্ছে পিপিই। যা স্বাস্থ্যের জন্য চরম ঝুঁকি। এসব কাপড়ে করোনার মতো ভাইরাসের সংক্রমণ প্রতিরোধ সম্ভব নয়। জানা মতে, স্মার্ট গ্রুপের পিপিইর কাপড় অনেকটাই রেইনকোটের। তা ভাইরাস ঠেকাতে ভূমিকা রাখার পরিবর্তে বিপদে ফেলবে।’

এ প্রসঙ্গে কথা হয় স্মার্ট গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মুজিবুর রহমানের সাথে। আপনাদের বানানো পিপিই স্ট্যান্ডার্ড মানের কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এটা আমি তো বলতে পারব না। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর আমাদের থেকে স্যাম্পল নিয়ে গেছে, ওরা দেখে বলছে এটা আপৎকালীন সময়ে আমাদের দিতে হবে। এটা আসলে বাংলাদেশে সাপ্লাই দেওয়ার জন্য বানায় নাই। এই বায়ারের কাজ আমাদের ২০২৩ সাল পর্যন্ত। কন্টাক্ট অনুযায়ী তাদের দিতাম। সরকার যখন জানলো, আমরা এরকম একটা ফেব্রিক ইমপোর্ট করে থাকি। তারপর তারা স্যাম্পল নিয়ে গিয়ে বলে, এটা ল্যাবে অ্যাপ্রুুভ হইছে। আপৎকালীন অর্ডার ড্রপ করে আমাদের দেশকে বাঁচাতে হবে। এটা নিয়ে আমরা মোকাবেলা করতে পারব।’

কাদের জন্য পিপিই তৈরি হচ্ছে—এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘আমার প্রোডাক্টটা হলো আমেরিকায় এক্সপোর্ট করার জন্য। সরকার বলছে, এই প্রোডাক্ট আমাদের ডাক্তাররা ইউজ করবে।’

কিন্তু এই পিপিই সার্টিফাইড কিনা— এমন প্রশ্নের জবাবে মুজিবুর রহমান বলেন, ‘এটা আমি জানি না। গভর্মেন্ট জানে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর নিশ্চয়ই টেস্ট করে দেখছে এটা পজিটিভ। কারণ এখানে কোন সেলাই নেই। আমরা যে মেশিনে সেলাই, সেটা এয়ারটাইট যাকে বলে। যখন এয়ারটাইট হয় তখন তো ভাইরাস ঢুকতে পারবে না। অর্থাৎ যে ভাইরাস আছে সেটা বাতাসের মাধ্যমে ঢুকবে। এটা এয়ারটাইট তাই সমস্যা নেই।’

‘পিপিই বানানোর জন্য আলাদা ফেব্রিকের প্রয়োজন— যা সবার কাছে নেই। কিন্তু কিছু কিছু কোম্পানি কাপড় দিয়ে বানিয়ে দিচ্ছে যা মূলত রেইনকোটের মতন। এখন পৃথিবীজুড়ে হাহাকার, সব দেশে পিপিই সংকট আছে। কিন্তু আমাদের কাছে যা আছে তা জনবল অনুযায়ী খুবই অপ্রতুল। এখন যেহেতু পর্যাপ্ত পিপিই নাই তাই প্রাথমিক চিকিৎসা উপযোগী হিসাবে যেগুলো বানানো হচ্ছে তা আপাতত হিসেবে ব্যবহার করা যায়। কিন্তু দীর্ঘ সময়ের জন্য নয়। মানসম্মত পিপিই’র ব্যবস্থা করা উচিত আমাদের।