,

ছোটগল্প – ‘ক্ষুধা’

আজকের কুমিল্লা ডট কম :
March 15, 2021
news-image

কাজী রাজিয়া সুলতানা:
আর দু’ক্রোশ হাঁটতেই সামনে একটা পরিত্যাক্ত বাড়ি। শহরের রাস্তা শেষ হয়ে মফস্বলের আভরণ ভেদ করে একটি পুরোনো জঙ্গলের মত যায়গা। গাছপালাগুলো কেমন ভূতুরে ভাবে একে অপরের সাথে গভীর নাদে কখনও হেসে হেসে দোল খায়, কখনও নিশ্চুপ হয়ে পাশের পঁচা ডোবা থেকে মরা কান্নার ডাক শুনে। ক্লান্ত একটি বালক হাঁটছে পুরোনো ঘরটাকে উদ্দেশ্য করে। তার চোখেমুখে আতঙ্ক। দীর্ঘদিন অনাহার অর্ধাহারে দিন কেটেছে তার। পরনে ছেড়া একটি হাফহাতা শার্টের ভেতর দিয়ে উঁকি দিচ্ছে হাড্ডিসার দেহ আর হাঁটুর সামান্য নিচে পড়া একটি ময়লা প্যান্ট যেন তার জুতাবিহীন কালো পায়ের বুকে একটুকরো শোকের চিহ্ন। অযতেœ অপরিষ্কার দেহটি যখন ঘরটির সামনে চলে আসলো, তখন তার পোঁকায় খাওয়া ময়লা দাঁতগুলোতে একটু হাসির ঝলক ছড়িয়ে গেলো। বাহ্যিক ময়লার আবরণে এই হাসি যেন নির্মল স্বচ্ছ সরোবরের মতই পবিত্র।

পুরোনো ঘরটির পেছন দিকটায় দাঁড়ালো জিহাদ। ঘরের জীর্ণ কাঠের জানালার ভাঙ্গা অংশ থেকে মিটিমিটি আলো এসে পড়ছে বাহিরের লতাপাতাগুলোর উপর। অন্ধকারের বুকে সামান্য আলোর ঝলকের মত ঝিলমিলে রঙ্গের খেলায় মেতেছে আলোগুলো। হালকা আলোয় জিহাদ নিজের ময়লা অভুক্ত হাত-পা গুলোর দিকে একটু তাকালো ; আবার তাকালো ঐ ঘরটির দিকেও। ঘরটিও তারই মত যেন অনেকদিনের পিপাসিত। জিহাদের মনে হলো, তার পেটের মতই এই ঘরেও পানি আর খাদ্য পড়েনা অনেকদিন ; তাইত এর জীর্ণশীর্ণ শরীরটা যেন জিহাদকে খেতে উদ্যত হয়েছে। তার ভাঙ্গা মরচে পড়া টিনের চালাগুলো থেকে যেন লকলকে জিহ্বা বের করে সামনে নিয়ে আসছে ; আর উদ্যত ভঙ্গিতে রক্তস্নাত সেই জিহ্বার লেলিহান শিখা এখনই বোধহয় তাকে পুড়িয়ে ভস্ম করে দিবে, আর তার ছাঁইয়ের গুড়াতে দীর্ঘদিনের পিপাসা মিটাবে।

জিহাদ দেখল কোনো একটা আবছায়া আলোর রশ্মিগুলোর উপর দিয়ে একেঁবেঁকে ঢেউখেলানো ভঙ্গিতে চলে গেলো। ঘরের মৃদু আলোটা যেন আরও মৃদু হয়ে উঠেছে। জিহাদ জানলার পাশ থেকে একটু সড়ে দাঁড়ালো। এর ঠিক উল্টোপাশেই ঘরের দুইপাল্লার কাঠের দরজা। দীর্ঘদিনের অযতেœ দরজার পাল্লাগুলোও আধারের রঙ্গে ছেয়ে গেছে। মরচে পড়া একটি কড়ায় আস্তে আস্তে নাড়তে থাকলো জিহাদ। প্রথমে ঘরটির মধ্য থেকে সামান্য গুণগুণ আওয়াজ আসলেও একটি কিশোরের হাতের স্পর্শের আভাসে যেন গোটা ঘরটা নিস্তব্ধ পুরীর মত খাঁখা করতে লাগল। জিহাদ এবার আবারো কড়া নাড়লো। তীব্র ক্ষুধার তাড়নায় তার চোখ দুটিতে ভয়ের কোনো লেশ ছিলনা, কিন্তু হঠাৎ এই কালোর পুরীর দেশ যেন ওর প্রতি লোমকূপে ভয়ার্ত একটি আভাসের রঙ্গে খেলে গেল। তোতলাতে তোতলাতে বলে উঠলো – ‘কে-কে-কেউ আ-আছেন? তার মৃদু শব্দে এবার নিস্তব্ধ পুরীর বুকে প্রাণের আকুতি জেগে উঠলো। আধারে ঢাকা দরজাটার একটি পাল্লা আস্তে করে সামান্য নড়ে উঠলো। দরজার ফাঁকে জিহাদ দেখলো এক নারী মূর্তিকে। আধারে তার মুখ ভালো করে দেখা যাচ্ছেনা। তবে মৃদ্যু আলোর ছন্দে তার অবয়বে মনে হয়, হয়ত কোনো মাঝবয়সী বিধবা হবে।

ঘন আধারে জিহাদের এবার আরও অদ্ভুত ঠেকতে লাগল। নারী মূর্তিটি এবার ঘরের ভেতর থেকে তার দৃষ্টি নিবদ্ধ করল জিহাদের উপর – কে ডাকে অমন করে?

‘কয়ডা খাওন দিবাগো? অনেক ভুক লাগছে। আইজ কয়ডাদিন পাড় হইয়া গেলো, পেডে কোনো দানাপানি পড়েনা। দাওনাগো কয়ডা খাওন।'(নিজের রুগ্ন পেটটাতে হাত বুলাতে বুলাতে বললো জিহাদ)।
আঁধারের নারী মূর্তিটা এবার জিহাদের দৃষ্টিগোচর হতে লাগলো। উসকো-খুসকো কাচা-পাকা চুল, এলোমেলোভাবে কাপড়টা কোনোরকমে গায়ে জড়িয়ে রেখেছে, চেহারাটা সদ্য রোগা হওয়ার প্রতীক বহন করছে। আঁধারের গা ঘেষে তখন পাতার মর্মরানির শব্দ। সেইসাথে দুটি অচেনা মানুষের যেন এককালীন দৃষ্টি একে অপরের উপর নিক্ষেপ করে রেখেছে। নিরবতার ঢাল ভাঙ্গলো মাঝবয়সী নারীটি- ‘কে বাবা তুমি? কোথথেকে আসলে এইখানে? এই পথেযে বিষম বিপদ তা তুমি জানোনা? চলে যাও এখান থেকে।’

না। জিহাদ সত্যিই জানেনা। কোন বিপদের ইঙ্গিত দিচ্ছে এই অপরিচিত রহস্যময়ী নারীটি! জিহাদ কিছু জানেনা। সে শুধু জানে ক্ষুধার যন্ত্রণার কথা। এরচেয়ে নির্মম কী হতে পারে? মানুষত খাদ্যের জোগানেই বেঁচে থাকে।
‘ পেডের খিদা আর কোনো বিপদ বুজেনাগো মা। পেডের খিদার মত বড় বিপদ আমি জিদ্দার মত রাস্তার মানুষগো কাছে আর কিছু নাই। কয়ডা খাতি দিলে পরাণডা বাঁচে। আইজ মেলা দিন উপাস কাডাই। ‘
নারীমূর্তিটি একমুহূর্তের জন্য যেন কী ভাবলো এরপর জিহাদকে ঘরের ভেতর ডাকলো। ত্রস্তপদে জিহাদ ঘরের মধ্যে প্রবেশ করলো। অনেকসময়ের অনশন কাটিয়ে তার খিদের নৌকাটি হয়ত অবশেষে পাড় হতে চলেছে।
মহিলাটি জিহাদকে একটি পাটি বিছিয়ে দিল বসার জন্য। জিহাদ এবার লক্ষ করলো, এই ক্ষণিক পরিচিতা নারীর এই গৃহটি যেন রহস্যাবৃত। এলেমেলোভাবে জীর্ণ জামাকাপড় ছড়িয়ে আছে অগোছালো ছেড়া কার্পেটের মাটির মেঝেতে। ঘরের এক কোণে সামান্য কিছু আসবাবপত্র, সাথে দুইটা পুটলি। শোবার মত মাত্র একটি ছোট তাকিয়া দরজার একটু দূরত্বে পাতা। তার পাশেই মেঝেতে পরে থাকা একটি ময়লা বিছানা। ঘরটির অবস্থা দেখে মনে হয় যেন মাত্র কিছুসময় পূর্বেই এর বুকে তাণ্ডবনৃত্য চালিয়েছে কেউ।

নাও বাবা, এই মুড়ি কয়টা আর এই গুঁড়টুকো মুখে দাও। মেয়েলি কণ্ঠের উষ্ণতায় তন্দ্রা ভাঙ্গলো জিহাদের। নারীমূর্তিটি যেন কোনো এক স্বর্গীয় দূত হয়ে তার সোনার পাত্রটি জিহাদকে উপহার দিতে এসেছে। অমৃতের মত দুহাত মুঠোভর্তি করে দুইমুঠো মুড়ি একসাথে মুখে পুড়ে ফেললো জিহাদ। কিন্তু মুখ থেকে দুপাশ দিয়ে কিছু মুড়ি গড়িয়ে মাটিতে পড়ে গেলো। এবার একটু গুড় মুখে নিল সে, যেন অমৃত খাচ্ছে।
আস্তে খাও বাবা, আস্তে। গলায় আটকাবেযে!

কিন্তু জিহাদের সেদিকে কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। তৃষ্ণার্ত চাতকের মত সে শুধু তার পিপাসাই মিটিয়ে যাচ্ছে। এবার জিহাদের মাথার এলোমেলো চুলগুলোতে হাত বুলিয়ে দিল নারীটি আর তার মাতৃত্ব মনের কণ্ঠে চুপিসারে ভেসে আসলো,-” আহারে! নাজানি কতসময়ের অভুক্ত সমুদ্র পাড় করে এই প্রাণগুলো! খা বাবা, একটু ভালো করে খেয়ে নে। কি করব! তোর গরীব মা তোকে দুইটা ভাত দিতে পারলোনা। আমিওযে কয়দিন খেতে পাইনারে। এইত একটু আগেই জানোয়ারগুলো এই রসকসহীন প্রাণটার উপরেই অট্টহাসির মহরা চালিয়ে কয়টা টাকা দিয়ে গেলো। এতরাতে চাল কেনারও সময় পাইনি। তুই আসলি হঠাৎ করে। খা বাবা খা। এগুলোই খা।’ বলতে বলতে নিজের চোখদুটি মুছে নিল ছেড়া আচলের কিনার দিয়ে।

‘মা’! তার প্রতি এমন শব্দ সে কোথায় কবে শুনেছিল, মনে করতে পারলো না। এবার জিহাদের খাওয়ার মাঝে গতি মন্থর হল। তার ক্ষুদার চাকা থামতে চাইলো। নিজের মা’কে দেখার ভাগ্য জিহাদের হয়নি। হয়ত দেখেছিল একেবারে ছোটবেলায়। কিন্তু তার মনে নেই, কেমন ছিল মা! যখন থেকে বুঝতে শিখেছে, তখন থেকে এই পৃথিবীর হাজারো মায়ের মাঝে মাটির মায়ের বুকে সে রাস্তার ধারে ধারে জীবন কাটিয়েছে। হয়ত মা থাকলেও তাকে এভাবে খাবার দিত, এত মমতা মায়েরইত হয়। মায়ের মত মমতাময়ী মাঝবয়সী এই নারীটি কখন তাকে আপন করে নিয়েছে সে যেন এতক্ষণ সেটা খেয়ালই করেনি।

সে খানিকক্ষণ অপলক দৃষ্টিতে তাকালো মুহূর্তে চেনা এই নারীমূর্তিটির দিকে। এবার তাকে আর জিহাদের কাছে অদ্ভুত আর রহস্যময়ী মনে হলো না। মনে হলো, যে অজানা নাড়ী ছিড়ে সে মাতৃগর্ভ থেকে এই অভিশপ্ত ক্ষুধার্থ পৃথিবীর পথে হেঁটে চলেছে, যার প্রতি অলিগলির ভেতর খেলাচ্ছলে জীবনের নির্মমতাকে অবলোকন করতে করতে কোনো মমতাময়ী হাতকে হাতড়ে বেরিয়েছে, যে আদরমাখা মুখটি দেখতে চেয়েছে, এ বুঝি সেই হাত-সেই মুখ।

জিহাদ কিছু বললোনা। আবার মাঁটির হাড়ির অবশিষ্ট মুড়িগুলোর দিকে চোখ নামিয়ে নিলো সে। এবার মুখে দুইমুঠো মুড়ি নিল না জিহাদ, বরং কিছুটা নিয়ে মুখে নিতেই যেন ওর কণ্ঠ ভারি হয়ে উঠলো। ওর গলা দিয়ে নামতে চাইলোনা খাবার। সঙ্গে-সঙ্গে কাশতে শুরু করলো ও।

নারীমূর্তিটি ওর অবস্থা দেখে উদ্বিগ্ন হল, এই দেখো দেখো আমিত পানি আনতে ভুলেই গিয়েছিলাম। একটু অপেক্ষা করো কষ্ট করে, আমি এক্ষুণি পানি নিয়ে আসছি।

স্টিলের পানিভর্তি গ্লাসটি জিহাদ নারীটির হাত থেকে নিয়ে এক নিঃশ্বাসে পুরোটা পানিই ঢকঢক করে গিলে ফেললো। ওর মনে হলো এই একদিনেই দুইরকম ঘটনা ঘটছে তারসাথে! মফস্বলের একটু বাহিরে আজই দুপুরে যখন খিদের জ্বালায় দ্বারে দ্বারে মানুষের পায়ে পড়তে পড়তে একটি রঙ্গিন গাড়ি থেকে নামা ছেলেটির পায়ে ধরেছিল জিহাদ ,তখনই ছেলেটি ওর হাতদুটো ঝাকরা মেরে ছাড়িয়ে নিলো নিজের পা থেকে। অথচ তার হাতেও ছিল খাবারের প্যাকেট। জিহাদ তখন বলেছিল-‘ শুধু একটু পানি দেন বাবু, একটু পানি দেন। বড্ড তিরাস লাগছে। এদিগে কোনোখানে কোনো পানির কলও যে পাইনা। আমাগো গেরামে যাইতে দেরি হইয়া যাইব। এইযে বড় বড় দালানগুলায় কেউ ঢুকতে দেয়না। বাইরে দারোয়ান মামা দেখলেই দৌঁড়ানি মারে। দেননা একটু পানি।’ ছেলেটা তখন খাবার পেকেটের সাথে থাকা পানির বোতলটা নিচে ছুড়ে মেরে আবার ঐ রঙ্গিন গাড়িটায় উঠে গেলো। জিহাদ তাকিয়ে ছিল এই রঙ্গের পৃথিবীর মানুষগুলোর গমনের দিকে। সে দুইবারই পানি পেলো, কিন্তু দুইরকম ভাবে। অদ্ভুত এই ‘খাবার’ জিনিসটি, আর অদ্ভূত এই পৃথিবী। একজন রঙ্গিনের ভেলায় চড়ে তাকে খাবার দিলনা, পানি ছুড়ে দিয়ে চলে গেলো ; আর একজন এই নারীমূর্তিটি, যে নিজের অস্তিত্ব বিক্রি করে খাবার জোগার করে, এক মুহূর্তেই পরম স্নেহে তাকে কিনা এভাবে খাওয়ালো!

একদিক দিয়ে জিহাদের ভালোই লাগলো। সে এবং এই অল্পসময়ের পরিচিত নারীটি, দুইজনই সমাজের নিচুতলার মানুষ; যাদেরকে সবাই শুধু ঘৃণাভরেই দেখে। তবে হ্যাঁ,ওদের বাহিরে চলার পথে এর ব্যতিক্রম কিছু মানুষও দেখে জিহাদ। তারাও রঙ্গিন দুনিয়ার বাসিন্দা, তবুও মাঝেমাঝে জিহাদের মত নিচুতলার মানুষদের ভালোবাসা বিলাতে আসে।

জিহাদের একবার মনে হলো এই মহিলাটিকে ‘মা’ বলে ডাকে। কিন্তু কীভেবে আবার চুপ করেই রইলো সে। সন্তর্পণে মাটির পাত্রটি হাত থেকে রেখে কিছু না বলেই বের হয়ে আসলো ও। একবারও পেছনফিরে তাকালোনা সে। যে পথে এসেছে, সেই পথেই হাঁটতে শুরু করলো। আসতে আসতে দরজার শব্দ পেলো সে, আর দেখলো, তার চোখের সামনে সেই ঘরের জানালার ভাঙ্গা অংশদিয়ে আবার আলোরা খেলে চলছে নিজ গতিতে…

 

রচনাকাল- ৮ মাঘ।। ১৪২৭ বঙ্গাব্দ।।