,

বীরমুক্তিযোদ্ধা আলী আকবর ভূঁইয়া ছিলেন শ্রমজীবি মানুষের অকৃত্রিম বন্ধু

আজকের কুমিল্লা ডট কম :
May 20, 2019
news-image

 

শাহাদাত হোসেন:

দেশমাতৃকার স্বাধীনতা অর্জনে যে তরুণ মুক্তিসেনা রেখেছিলেন গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা, দেশের গাড়ি সংযোজনকারী বিএসইসি’র একমাত্র প্রতিষ্ঠান প্রগতি ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডে শ্রমিকনেতা হিসেবে শ্রমিক-কর্মচারিদের স্বার্থসংরক্ষণে যিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন সেই নিবেদিতপ্রাণ সমাজকর্মী ও শিক্ষানুরাগী, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধকালীন প্লাটুন কমান্ডার আলী আকবর ভূঁইয়া ।

গত ৭ মে রাজধানীর একটি হাসপাতালে বর্ণাঢ্য সংগ্রামী জীবনের অবসান ঘটিয়ে না ফেরার দেশে চলে যান। মুক্তিযুদ্ধ শেষে প্লাটুন কমান্ডার আলী আকবর ভূঁইয়া ও প্লাটুন কমান্ডার এসএম খুরশিদ –এর নেতৃত্ব মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী কয়েকজন বীর মুক্তিযোদ্ধার অস্ত্র জমাদানের আগেই তোলা এ ছবি। ১৯৭১ সাল। তখন তিনি চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কাজেম আলী স্কুলের ছাত্র। এসএস সি পরীক্ষার্থী। বঙ্গবন্ধুর ঘোষণা –‘যার যা কিছু আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবিলা করতে হবে। এবারের সংগ্রাম আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম’ ‘ দেশের স্বাধীনতাযুদ্ধে অংশগ্রহণের দীপ্ত সাহসিকতা ভর করলো সেই এসএসসি পরীক্ষার্থী কিশোরের বুকে। জীবনবাজি রেখে পাড়ি জমালেন সীমান্তে। প্রশিক্ষণ নিলেন গেরিলাবাহিনীর। কলম ধরার কচি হাতে শত্রুনিধনের মরণাস্ত্র নিয়ে দেশে ফিরলেন মুক্তিযোদ্ধা গেরিলা বাহিনীর একটি প্লাটুনের কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব নিয়ে। মীরসরাইয়ের হাইতকান্দি ইউনিয়নের বাসিন্দা হলেও মুক্তিযুদ্ধকালে তাঁর প্লাটুনের দায়িত্ব ছিল সীতাকুণ্ডের বারৈয়াঢালা ইউনিয়নে।পরবর্তীতে তাঁর সকল সামাজিক কর্মকাণ্ডও পরিচালিত হতো সীতাকুণ্ড-মীরসরাই সীমান্ত বড়দারোগাহোটে। বারৈয়াঢালা এলাকার সামাজিক বিভিন্ন জটিল সমস্যা আলী আকবর ভূঁইয়ার নেতৃত্বে সালিশীবৈঠকে সুরাহা হতো।সাধারণ খেটেখাওয়া শ্রমজীবী মানুষের অকৃত্রিম বন্ধু ছিলেন তিনি। সকল ধর্মের মানুষের তিনি ছিলেন আস্থার প্রতিক।এতে করে মীরসরাইয়ের বাসিন্দা হলেও প্রায় সকলের কাছে তিনি সীতাকুণ্ডের লোক হিসেবে পরিচিত ছিলেন। মুক্তিযুদ্বের পর স্বাধীন-বাংলাদেশে শুরু হয় তাঁর জীবনযুদ্ধ। ছাত্রজীবনে ফিরে গেলেন বটে,কিন্তু জীবনযুদ্ধ সাথে নিয়ে। ছোট সরকারি চাকুরে বাবার অবসরগ্রহণ। এইচএসসি পরীক্ষার আগেই নিতে হয় বাবা, প্রায় অসুস্থ মা,ছোট দু’ভাইসহ পাঁচ সদস্যের এক পরিবারের গুরুদায়িত্ব। মা শারীরিক অসুস্থ হওয়ায় সাংসারিক ঘরোয়া দায়িত্বের জন্য বাবার নির্দেশে নিজের অমতে বসতে হয় বিয়ের পিঁড়িতে। অনেক চেষ্টায় শ্রমিকের চাকরি পান প্রগতি ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডে। পাশাপাশি বড় দারোগাহাটে ছোটখাট ব্যবসা। চুয়াত্তরের দুর্ভিক্ষ । অনেক কষ্টে নির্বাহ করেন সংসার। নিজের সুখ নিয়ে খুব ভাবতেন না। মা-বাবা, ভাইদের নিয়ে সংসারই ছিল ভাবনার মূখ্য বিষয়। তার সাথে সমাজকর্ম, সাংস্কৃতিক কর্ম, ট্রেড ইউনিয়ন ও রাজনীতি। হয়ে ওঠলেন একজন জনপ্রিয় সমাজকর্মী, ভালো ট্রেডইউনিস্ট। হিতৈষী যেমন জুটলো অনেক, হিংসুক একটা দলও জ্বলতে শুরু করলো। পঁচাত্তর পরবর্তী বৈরিসময়। হিংসুকের দল এবং যুদ্ধপরাজিত শক্তি; দু’দিক থেকেই চেষ্টা কীভাবে সিঁড়িটা কেড়ে নেয়া যায়, ভেঙে দেয়া যায়,স্তব্ধ করে দেয়া যায় সন্মুখযাত্রা। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের অপ্রতিরোধ্য তরুণ প্লাটুন কমান্ডার জীবনযুদ্ধেও নির্ভিক দুঃসাহসী, অকুতভয়ী চ্যালেঞ্জার। সকল চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করেছেন সাহসিকতার সাথে। হিংসুকের দল,পরাজিত শক্তি মরমে জ্বলেছে, হয়তো আজো। কিন্তু কমান্ডার দীপ্ত শক্তিতে তাঁর বাহিনী নিয়ে এগিয়ে যান সন্মুখে অপ্রতিরোধ্য গতিতে। যতক্ষণ নিঃশ্বাস ছিল ততক্ষণ দিয়েছেন যুদ্ধের নেতৃত্বে। স্বাধীনতাযুদ্ধে বিজয়ী বীরমুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার জীবনযুদ্ধেও বিজয়ী বীর। হেরে যাওয়া, হতাশা যাঁর অভিধানেই ছিল না। যিনি দিয়েছেন উজাড় করে, নেয়া বোধহয় তাঁর স্বভাবেই ছিল না। যারা তাঁর যাত্রাপথ কন্টকাকীর্ণ করতে চেয়েছে তাদের অনেকেরই যাত্রাপথ মসৃণ করেছেন তিনি নিজেই। প্রগতি ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের একটি অনুষ্ঠানে মুক্তিযুদ্ধকালীন প্লাটুন কমান্ডার আলী আকবর ভূঁইয়া , শ্রমিকনেতা ও মুক্তিযুদ্ধকালীন প্লাটুন কমান্ডার মফিজুর রহমান ও বীরমুক্তিযোদ্ধা নুরুল গনি আলী আকবর ভূঁইয়ার বাড়ি চট্টগ্রামের মীরসরাই উপজেলার মহালংকা গ্রামে। ১৯৫৫ সালের ১ জানুয়ারি তিনি এ গ্রামের ফিতুর মোহাম্মদ ভূঁইয়া বাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবার নাম বাদশা মিয়া ভূঁইয়া ,মাতা জোহরা খাতুন। মীরসরাইয়ের মুক্তিযোদ্ধা প্লাটুন কমান্ডার আলী আকবর ভুঁইয়া চাকরির পাশাপাশি নানান সামাজিক ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িত ছিলেন। তিনি হাইদকান্দি ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি, মহালংকা উচ্চবিদ্যালয় পরিচালনা পরিষদের সভাপতি, প্রগতি ইন্ডাস্ট্রিজ শ্রমিক কর্মচারী লীগ (সিবিএ) এর কার্যকরী সভাপতি,প্রগতি ইন্ডাস্ট্রিজ জাতীয় শ্রমিকলীগের সভাপতি, বড়দারোগাহাটস্থ প্রগতি সংঘের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ও সাধারণ সম্পাদক, ফিতুর মোহাম্মদ ভূঁইয়াবাড়ি জামে মসজিদ পরিচালনা পরিষদের সদস্যসহ এলাকার বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের সাথে জড়িত ছিলেন।

মৃত্যুকালে আলী আকবর ভূঁইয়া স্ত্রী, দু’ছেলে,দু’মেয়ে, ছোট দু’ভাই, নাতি-নাতনীসহ অসংখ্য আত্মীয়স্বজন ও গুণগ্রাহী রেখে গেছেন। তাঁর বড়ছেলে মো. মেজবাহ উদ্দিন ভূঁইয়া(লিটন) কুমিল্লার মনোহরগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি)হিসেবে কর্মরত আছেন। ছোট ছেলে মো. আফতাব উদ্দিন ভূঁইয়া (সোহেল) তথ্যমন্ত্রণালয়ের অধীন বাংলাদেশ প্রেস ইনস্টিটিউটের মেনটেন্যান্স ইঞ্জিনিয়ার।