,

একটি গ্রামের গল্প

আজকের কুমিল্লা ডট কম :
December 20, 2020
news-image

 

নুহাস রহমান:

সূর্য আজ প্রকটভাবে আলো দিচ্ছে। চারদিকে ঘুমোট বাঁধা তিনদিনের অন্ধকার আজ ঘুছে রৌদ্রের প্রখর তাপে। আমাদের গ্রামের সবাই ঘর থেকে বের হয়েছে কাজে যাওয়ার জন্য। আমাদের গ্রাম শহর থেকে প্রায় ৪০ কিলোমিটার দূরেই। আমাদের গ্রামে এখনো বিদ্যুৎ আসেনি, এখনো হয়নি পাকা সড়ক। গ্রামের চারদিকে গাছ-গাছালি ছেয়ে আমাদের। সকালে আমাদের সকলের ঘুম ভাঙ্গে দোয়েল পাখি কিচিরমিচির আর মুরগির কুক কুরু আওয়াজে। রাতের বেলায় ও খুব সুন্দর চাঁদের আলোয় সকলে শান্তিতে বাস করে। আমাদের গ্রামে সবকিছুই চলছে সুন্দর ভাবে। সবাই সকলের কাঁধে ভর করে একসাথে কাজ করে যাচ্ছে গ্রামের জন্য। হঠাৎ নেমে আসে কালোছায়া আমাদের গ্রামের উপর। আকাশে ঘন কালো মেঘের মতো চারদিকে হইচই পড়ে উঠে। ঐদিন আমাদের গ্রামে জলকেলি উৎসব ছিল। আমাদের চাকমা আদিবাসীদের জন্য এই দিনটা অত্যন্ত জনপ্রিয় ও শান্তির। উৎসব শেষে সবাই যখন বাড়ি ফিরছিল পথের অনতিদূরে একটি লাশ পড়ে আছে দেখল সবাই।

সবাই দৌড়ে গেল ঐ খানে। লাশটা দেখে সবাই অবাক ওদের গ্রামের দিমিত্র এর ছেলের লাশ। সবার মুখ ভয়ে কুঁকড়ে গেছে। দিমিত্র হাউমাউ করে কাঁদতে লাগলো। গ্রামের গুরুজন ভবিষ্যৎবাণী করতে লাগল, আমাদের গ্রামে আবার সেই বহু বছরের পুরনো দানো এর আবির্ভাব হয়েছে। তাই এই হত্যা হয়েছে। সবাইকে মেরে ফেলবে এই দানো। তাই সন্ধ্যার পরে কেউ যাতে বের না হয় তা বলে দিল তারা। এখন আর কেউ ঘর থেকে বের হয় না সন্ধ্যার পড়ে। গ্রামের মুড়ল মন্দিরের পূজার সাথে কথা বলে বলেছে, রাতের আধারে এই দানব বেশি সক্রিয়। তাই কেউ যাতে রাতে অন্ধকারে ঘর ছেড়ে বের না হয়। যে যেখানেই থাক না কেন রাতের আঁধার নামার আগেই ফিরে আসতে হবে গ্রামে। তার কথামতো এখন কেউ বের হয় সন্ধ্যার পড়ে। এখন রাতে অদ্ভুত ধরনের চিৎকার শোনা যায়। মা কে যখন জিজ্ঞেস করলাম, কিসের আওয়াজ মা এটা? এত বিশ্রী আওয়াজ কখনো শুনিনি। মা বলল, এটা ওই দানবের আওয়াজ। খাবার না পেলে এমন অদ্ভুত চিৎকার করে এই দানব শুনলে সারা শরীরে শিরশিরিয়ে ওঠে। গায়ের লোম কূপ দাঁড়িয়ে যায়। ভয় লাগে ভীষণ যেন এখনি নেমে আসবে ওদের কাছে। রাতের আধারে কেউ বের হওয়া এখন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। সকালে যখন মুরগির কুক কুকরো আওয়াজ শুনি তখন আমরা সকলে একসাথে দরজা খুলে বের হই। আজ সকালে ঘুম থেকে উঠে কাজ করতে চলে গেছে গ্রামের সবাই। আমি, রুপম এবং অনিন্দ্য একসাথে বসে আছি। আলোচনা চলছে ঐ দানব নিয়ে। আমি ওদের বললাম, চল না ঘুরে আসি পুরো গ্রামটা। কোথাও কোন ক্ষতি হলো কি না দেখে আসি। ওদেরকে নিয়ে গ্রামে চারদিকে চক্কর দিতে গেলাম।

প্রায় অর্ধেক যখন গেলাম গ্রামে কিছুই নজরে পড়লো না সন্দেহ করার মতো। হঠাৎ মায়ের বলা ভয়ংকর ঢিপিটা দেখতে পেলাম। কি অদ্ভুত ভাবে দাঁড়িয়ে আছে? দেখলেই ভয় লাগে যেন ভূতুড়ে কোন বাংলাো। শরীরটা নিজে নিজে যেন নড়ে বসলো। অদ্ভুত এক ভয় যেন ছায়া পেতে বসল মনে। ঢিপিটা থেকে একটু সামনে কি যেন একটা পড়ে আছে। রুপমকে বললাম, গিয়ে দেখে আয় তো ওটা কি? আমি! না বাবা আমি পারবো না। আমার ভয় লাগছে! তুই বরং অনিন্দ্যকে বল। অনিন্দ্য এর দিকে তাকালাম। বুঝতে পারলাম ও যেতে রাজি নয়। মুখে ওদের দুজনের ভয়ের ছাপ স্পষ্ট। যেন ভয়ের ছুটে এখনি পালিয়ে যায়। আমি বললাম, আচ্ছা চল তিনজন একসাথে যাই। তিনজনে ওই দিকে পা বাড়ালাম। যত জিনিসটা নিকটে যাচ্ছি তত ভয় কাজ করছে। কলিজার ভেতরটা টিপ টিপ করছে। হৃদয় স্পন্দন বেড়ে গেছে। যখন বস্তুটার কাছাকাছি হলাম মানুষের একটা বীভৎস চেহারা ফুটে উঠল চোখের সামনে। জগদীশ চাচার চেহারা। কোন পশু যেন নিংড়ে ছুঁরে ফেলেছে তাকে। তারা তিনজন ভর্য়াত ভাবে চিৎকার করতে থাকলো। আমার চোখ দিয়ে অশ্রু বিন্দু গড়িয়ে পড়ছে গাল বেয়ে। মুখে কোন কথা আসছে না। ঠোঁট গুলো থরথর করে কাঁপছে। বারবার মনে হচ্ছে, চাচা আমাকে কত আদর করতেন, কোলে বসিয়ে নানান গল্প বলতেন। আমাদের জাতির বীরত্বের কথা বলতেন। তিনি ছোটখাটো একটা ইতিহাসের বই ছিল আমার কাছে। ও না কে এইভাবে দেখব ভাবতে পারেনি। রাতে চাচার বের হয়েছে কেন? কতগুলো প্রশ্ন জেগে উঠল মনে! চাচাতো সব জানত তাহলে তিনি রাতের আধারে বের হলেন কেন? এই প্রশ্নটা বারবার মনে সন্দেহের বীজ বুনে দিচ্ছিল? গ্রামের সবাই লাশের চতুর্দিকে দাঁড়িয়ে আছে। মোড়ল ও আসলো তখন। সবাই চাচার লাশের পাশে জড়ো হয়ে রয়েছে। সবার মুখে আতঙ্ক চেয়ে আছে। একজন আমাদের বয়সী যুবক যে শহর থেকে ছুটিতে এসেছে। সে বলে উঠলো, বলেছিলাম এই গ্রাম আমাদের কী দেবে? কী আছে এখানে। না দু-বেলা খাবার, না পড়ার মতো কাপড়। সারাক্ষণ রয়েছে মৃত্যুর হাতছানি। আমাদের সকলের শহরে চলে যাওয়া উচিত। কেউ কিছুই বলল না। যুবকটির মুখের দিকে তাকিয়ে রইল সবাই। সবাই বলাবলি করছে ঐ দানবটি এই কাজ করেছে। এই ঢিপিটার ভেতরের বাস করে ঐ দানব। আমি চিন্তায় পড়ে গেলাম, কী করা যায়? এভাবে চলতো আমাদের গ্রাম শূন্য হয়ে যাবে একদিন। কেউ বেঁচে থাকবে না। আমাদের গ্রাম ছিন্নভিন্ন হয়ে যাবে। আর শুনবো না পশুপাখির ডাক, ভোরের সকালের সূর্যের রাঙা আলো, মনো-মুগ্ধকর বাতাস এইসব কিছু আর থাকবে না।

আর করবে না আন্দোলিত আমাদের। শুধু থাকবে মানুষের হাহাকার। সকলে যদি শহরে চলে যায় তাহলে বা কী হবে। শহরে কি আর এইসব আছে, গাছপালা কেটে মানুষ অট্টালিকা তৈরি করছে। যান্ত্রিকতার আওয়াজ চারদিকে! কী করবো বুঝতে পারছি না। সকলে জগদীশ চাচার লাশ নিয়ে আসছে। জগদীশ চাচার হাতে কিছু একটা দেখতে পেলাম। সচরাচর এটা দেখতে পাওয়া যায়, যখন কাউকে ব্লেড দিয়ে কেউ আক্রমণের চেষ্টা করে তখনই এরকম চিহ্ন তৈরি হয়। তার লাশটা দেখে গ্রামের মানুষ যে প্রচুর পরিমাণ ভয় পেয়েছে তা বুঝতে পারলাম। কিন্তু এটা তো খুন ও হতে পারে। কারন একটা পশু মারার চেষ্টা করলে তাকে নখ দিয়ে খাঁমচাবে। বীভৎস ভাবে তার মাংস খুবলে খাবে। কিন্তু জগদীশ চাচার সাথে এরকম কিছু হয়নি। তার চোখ উঠিয়ে নেয়া হয়েছে, হৃদপিণ্ডটা বের করে ফেলা হয়েছে। শরীরের কোন অঙ্গ পতঙ্গ নেই। সব কিছু কেউ যেন বের করে নিয়েছে। এই ঢিপিটার ভেতর এমন কিছু চলছে যা কোন দানব নয় মানুষের কাজ। আগে একজন লোক গ্রাম পাহারা দিত, এই দানবের আসার ফলে লোকটি চলে গেছে কোথায়? কোথায় গেছে কেউ জানে না। সকলের সন্দেহ করছে দানবটা এই পাহারাদারকে মেরে ফেলেছে। জগদীশ চাচার শেষ কীর্তি শেষ হবার পর সকলেই যার যার কাজে চলে গেল। কেউ যেন মাথা ঘামাতে চায় না এ ব্যাপারে। তাদের বিশ্বাস একদিন তো মরতে হবেই না হয় এভাবেই মরি। আমি, রূপম, অনিন্দ্য বসে রইলাম। ওদের দুজনের মাঝে এখনও ভয় কাজ করছে। মুখে তা স্পষ্ট ফুটে রয়েছে। ওদের দুজনকে নিয়ে আবার হাটা শুরু করলাম। এবার গন্তব্য জগদীশ চাচার ঘর খানায় যাওয়া। কারন চাচার ঘরটা ঢিপিটার একদম বরাবর। তার ঘরে গেলে হয়তো কোন রহস্যের কূল কিনারা করা যাবে। চাচার ঘরের সামনে এসে দাঁড়ালাম তিনজন। ঢিপিটা যেন এখন আরো ভয়ঙ্কর লাগছে। রুপম বললো, জলদি ঘরে চল, আমার বাইরে দাঁড়াতে ভয় করছে। চাচা ঘরে একা থাকতেন তাই ঘরে বিশেষ কোনো মালপত্র ছিল না। একটা খাটিয়া, একটা পানির পাত্র, দুটো কাপড় রাখার জন্য টাঙ্ক ছাড়া চোখে পড়ার মতো কিছুই নেই। দুটি তিনটি পুঁতি ছিল তালপাতার। চাচাই একমাত্র লোক ছিলেন যিনি লেখাপড়া জানতেন, শাস্ত্র সম্পর্কে ধারণা ছিল যার প্রচুর। এলাকার কোন অসঙ্গতি থাকলে তিনি প্রশ্ন তোলতেন। তাঁর এক অসাধারণ ক্ষমতা ছিল। তিনি সকলকে সাহায্য করতেন, সকলে নতুন কিছু জানলে তিনি জানাতেন কী ভাবে কী কাজ করতে হয়। তিনি আমাদের গ্রামের রুপ রেকা পাল্টে দিয়েছিলেন। তাকে মেরে কার কী লাভ হতে পারে বুঝতে পারলাম না? তার সাথে কারো কোন শত্রুতা ছিল না। পুরো ঘরটার একবার তাকালাম চোখে পড়ার মতো কিছু পেলাম না। পুরো ঘরটা দু-বার করে ভালো করে দেখে নিলাম। কিছুই পেলাম না। সামান্য।

একটা জিনিস চোখে পড়লো, তাল পাতার পুঁথি গুলোতে তিনি একটা জায়গায় দাগ দিয়ে রেখেছেন। এটা থেকে কিছুই বুঝতে পারলাম না। জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়ালাম, এখান থেকে ঢিপিটার মুখটা পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে। চাচা হয়তো জানালা দিয়ে কিছু একটা দেখেছে, হয় তো দানব টাকেই দেখেছে। দানবটাকে দেখেছেন তাই তো তিনি বের হয়েছিলেন মনে হয়। সন্দেহের বীজ আরো জোরালো হতে লাগল। তালপাতার পুঁথি আমার সাথে নিয়ে নিলাম। পুঁথিটা নিয়ে আমি সরাসরি পূজারী সামনে হাজির হয়ে গেলাম। রুপম আর অনিন্দ্য তাদের ঘরে ফিরে গেল। ওরা যে এত ভয় পাবে আমি ভাবতে পারিনি। পূজারিকে গিয়ে প্রণাম করলাম। পূজারির হাতে পুঁথিটা দিয়ে বললাম, আমাকে পুঁথিটা বুঝিয়ে দেওয়ার জন্য। আমাকে দয়া করে এই প্রতিটা অর্থ বিশ্লেষণ করে দিন। তিনি খুশি হলেন বুঝতে পারলাম। আমি তাকে সন্দেহের চোখে দেখতাম তাই আজ তার কাছে আশায় তিনি আগ্রহের সাথে আমার প্রস্তাব লুফে নিলেন। পূজারি সংস্কৃত বা অন্যান্য কোন ভাষায় পাতাটা পড়লেন। আমার কাছে কিছুই বোধগম্য হলো না। তিনি তারপর অর্থ বললেন, ” এই পৃথিবীর যা কিছু আছে।

লেখক: নুহাস রহমান, শিক্ষার্থী।