,

মানবিক মেসির মহত্ত্ব

আজকের কুমিল্লা ডট কম :
September 3, 2026
news-image

কর্নেল ডাঃ নাজমুল হুদা খান (অব.):

আর্জেন্টিনার জার্সিতে ২০৭ ম্যাচে ১২৫ গোল করে বর্ণাঢ্য এক আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের ইতি টেনেছেন লিওনেল মেসি। দেশের হয়ে ২০২২ বিশ্বকাপ, দুটি কোপা আমেরিকা এবং ফিনালিসিমা জয় করে তিনি আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দেন। লিওনেল মেসির ক্যারিয়ার নিয়ে আলোচনা করতে গেলে আমরা সাধারণত তাঁর গোল, অ্যাসিস্ট, রেকর্ড, ট্রফি কিংবা বিশ্বকাপ জয়ের কথা বলি। ফুটবল মাঠে মেসি হয়তো প্রতিপক্ষের গোলরক্ষককে পরাস্ত করেছেন অসংখ্যবার। তাই ম্যারাডোনার হাত ধরে আর্জেন্টিনা এবং গ্রেটেস্ট অফ অল টাইমস লিওনেল মেসির ভক্ত বিশ্বের শত শত কোটি ফুটবলপ্রেমীর কাতারে আমিও । কিন্তু মাঠের বাইরে তাঁর সবচেয়ে বড় জয় অন্য কিছু—মানুষের হৃদয় জয় করা। আর সেই কারণেই লিওনেল মেসিকে শুধু একজন মহান ফুটবলার হিসেবে নয়, একজন মহান মানুষ হিসেবেও স্মরণ করা যায়। তিনি শুধু একজন বিশ্বসেরা ফুটবলার নন—তিনি একজন সহমর্মী ও মানবিক মানুষ।

মেসির দাতব্য কর্মকাণ্ডের পরিধি বিস্তৃত। বিভিন্ন সময়ে তিনি হাসপাতাল, স্বাস্থ্যসেবা, শিশুদের শিক্ষা এবং দুর্যোগকবলিত মানুষের সহায়তায় অর্থ ও সময় ব্যয় করেছেন। মেসির প্রতিষ্ঠিত লিও মেসি ফাউন্ডেশন বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে শিশু ও অসহায় মানুষের কল্যাণে কাজ করেছে। ইউনিসেফের সঙ্গেও তাঁর দীর্ঘদিনের সম্পৃক্ততা রয়েছে।

শিশুদের জন্য বিশেষ মমতা

শিশুদের প্রতি মেসির বিশেষ মমতার অনেক উদাহরণ রয়েছে। বার্সেলোনার সেন্ট জোয়ান হাসপাতালে ক্যান্সার আক্রান্ত শিশুদের চিকিৎসার জন্য একটি বিশেষ বিভাগ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগে তিনি অংশ নেন। তহবিল সংগ্রহের সে প্রচেষ্টার শেষ পর্যায়ে নিজেও বড় অঙ্কের অর্থ সহায়তা করেন। শিশুদের ক্যান্সার চিকিৎসার জন্য হাসপাতালটি একটি নতুন বিশেষায়িত বিভাগ চালুর উদ্যোগ নিলে মেসি সেই প্রচারণায় যুক্ত হন এবং মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরিতে ভূমিকা রাখেন। প্রায় ২ কোটি ৭০ লাখ ইউরো সংগ্রহের পর লক্ষ্যমাত্রা পূরণে ঘাটতি থাকা শেষ ৩০ লাখ ইউরো মেসি নিজে অনুদান হিসেবে প্রদান করেন।

দুর্যোগকবলিত মানুষের পাশে মেসি

মানবিকতার এ দৃষ্টান্ত শুধু অর্থ সহায়তায় সীমাবদ্ধ নয়। ২০১০ সালের ভয়াবহ ভূমিকম্পের পর মেসি হাইতিতে যান। সেখানে তিনি প্রায় ৫০ হাজার বাস্তুচ্যুত মানুষের আশ্রয় নেওয়া একটি ক্যাম্প পরিদর্শন করেন। মেসি ক্যারেফোর এয়ার নামের একটি শরণার্থী শিবিরে যান, যেখানে ভূমিকম্পে ঘরবাড়ি হারানো প্রায় ৫০ হাজার মানুষ আশ্রয় নিয়েছিল। তিনি সেখানে পরিবার ও শিশুদের সঙ্গে সময় কাটান এবং ইউনিসেফের কর্মীদের সঙ্গে কথা বলে হাইতিতে তাঁদের মানবিক সহায়তা কার্যক্রম সম্পর্কে জানতে পারেন।

শেকড়কে কখনো ভুলে যাননি মেসি

মেসির জন্ম আর্জেন্টিনার রোজারিও শহরে। বিশ্বখ্যাত হওয়ার পরও নিজের শহরের মানুষের কথা তিনি ভুলে যাননি। তাঁর শৈশবের ক্লাব নেওয়েলস ওল্ড বয়েজ এবং রোজারিওর বিভিন্ন যুব প্রকল্পে তিনি বিভিন্ন সময়ে সহায়তা করেছেন। করোনাভাইরাস মহামারির সময় রোজারিও অঞ্চলের হাসপাতালগুলোতে ভেন্টিলেটরের সংকট দেখা দিলে মেসি হাসপাতালগুলোকে ভেন্টিলেটর সরবরাহে সহায়তা করেন। এ সময় মেসি কাতালোনিয়ার একটি হাসপাতাল ক্লিনিক এবং আর্জেন্টিনার একটি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ১০ লাখ মার্কিন ডলার অনুদান দেন। ২০১৩ সালে তিনি রোজারিওর একটি স্থানীয় হাসপাতাল সংস্কারের জন্য প্রায় ৬ লাখ ৫০ হাজার ইউরো অনুদান দিয়েছিলেন।

যুদ্ধবিধ্বস্ত শিশুদের শিক্ষার সুযোগ

যুদ্ধ শুধু মানুষের জীবন কেড়ে নেয় না; শিশুদের কাছ থেকে কেড়ে নেয় শিক্ষা, স্বপ্ন ও ভবিষ্যতের সম্ভাবনাও। সিরিয়ার যুদ্ধবিধ্বস্ত শিশুদের জন্যও মেসির ফাউন্ডেশন সহায়তা করেছে। ২০১৭ সালে তাঁর ফাউন্ডেশন ইউনিসেফকে সহায়তা দেয়, যার মাধ্যমে সিরিয়ার তারতুস ও দামেস্কে নতুন শ্রেণিকক্ষ স্থাপন করা সম্ভব হয়। এর ফলে যুদ্ধের কারণে শিক্ষা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া প্রায় হাজার হাজার শিশু আবার স্কুলে ফিরতে পারে।

প্লাস্টিকের ব্যাগের সেই ছোট্ট মেসি-ভক্ত

২০১৬ সালে আফগানিস্তানের পাঁচ বছর বয়সী এক শিশুর ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়। মরতজা আহমাদি নামের শিশুটি মেসির নাম ও জার্সি নম্বর লেখা নীল-সাদা প্লাস্টিকের ব্যাগ পরে ছবি তুলেছিল। ছবিটি মেসির নজরে আসে। মেসি শিশুটিকে স্বাক্ষর করা আর্জেন্টিনার একটি জার্সি পাঠান। পরে বার্সেলোনা দোহায় একটি প্রীতি ম্যাচ খেলতে গেলে শিশুটিকে মেসির সঙ্গে দেখা করার সুযোগ করে দেওয়া হয়। মাঠে প্রবেশ থেকে শুরু করে মেসির সঙ্গে সাক্ষাৎ—সবকিছুই শিশুটির জন্য হয়ে ওঠে আজীবনের স্মৃতি। একজন শিশুর ছোট্ট স্বপ্নকে গুরুত্ব দেওয়ার এই ঘটনাটি হয়তো কোনো বড় দানের পরিমাণ দিয়ে মাপা যায় না। কিন্তু মানবিকতার মূল্য সব সময় অর্থের অঙ্কে নির্ধারিত হয় না।

বিয়ের উপহারও মানুষের জন্য

মেসির বিয়ের সময় পরিবার ও বন্ধুদের কাছে তাঁদের জন্য উপহার না কেনার অনুরোধ জানান। এর পরিবর্তে তাঁরা অতিথিদের সেই অর্থ নিজেদের পছন্দের কোনো দাতব্য প্রতিষ্ঠানে দান করতে বলেন। এর মধ্যে লিও মেসি ফাউন্ডেশনও ছিল—যাতে মানুষের জীবনকে আরও সুন্দর ও উন্নত করার জন্য মেসি তাঁর মানবিক কর্মকাণ্ড অব্যাহত রাখতে পারেন।

 

ইউনিসেফের শুভেচ্ছাদূত

২০১০ সালে লিওনেল মেসি ইউনিসেফের শুভেচ্ছাদূত হিসেবে যুক্ত হন। দায়িত্ব গ্রহণের পর তিনি ইউনিসেফের সঙ্গে হাইতি সফর করেন। সেখানে সাম্প্রতিক ভয়াবহ ভূমিকম্পের পর শিশুদের দুর্দশা ও সংকট সম্পর্কে বিশ্ববাসীর মধ্যে সচেতনতা তৈরিতে ভূমিকা রাখেন। পরবর্তী সময়ে করোনাভাইরাস মহামারির সময়ও মেসি ইউনিসেফের কার্যক্রমে সহযোগিতা করেন। সংক্রমণ প্রতিরোধের বিভিন্ন উপায় সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করার পাশাপাশি ইউনিসেফের জরুরি সহায়তা কর্মসূচির জন্য তহবিল সংগ্রহেও তিনি ভূমিকা রাখেন।

লিও মেসি ফাউন্ডেশন

২০০৭ সালে মেসি প্রতিষ্ঠা করেন লিও মেসি ফাউন্ডেশন। এর মূল লক্ষ্য হলো বিশ্বের সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও সামাজিক উন্নয়নে সহায়তা করা। ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে বিভিন্ন দেশে শিশুদের চিকিৎসা, শিক্ষা, পুষ্টি ও খেলাধুলার সুযোগ তৈরিতে সহায়তা দেওয়া হয়েছে। মেসি বিশ্বাস করেন, একজন শিশুর মুখে হাসি ফোটানোই বড় অর্জন। নিজের মানবিক দর্শন সম্পর্কে মেসি বলেছেন, তিনি ফুটবলার হওয়ার স্বপ্ন পূরণ করতে অনেক সংগ্রাম করেছেন। সেই পরিশ্রম ও সাফল্যকে তিনি এমন শিশুদের জন্য কাজে লাগাতে চান, যাদের সবচেয়ে বেশি সহায়তা প্রয়োজন। কোনো শিশুর মুখে হাসি দেখা কিংবা তার মনে নতুন করে আশার জন্ম দেওয়া তাঁকে গভীরভাবে আনন্দিত করে।

প্রতিবন্ধী শিশুদের খেলাধুলায় উৎসাহ

প্রতিবন্ধী শিশুদের খেলাধুলা ও সামাজিক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতেও মেসির ফাউন্ডেশন কাজ করছে।  বিশেষ অলিম্পিক আয়োজনের সঙ্গে তাঁর ফাউন্ডেশন দীর্ঘদিন ধরে সহযোগিতা করে আসছে। প্রতিবন্ধী শিশুদের খেলাধুলার সুযোগ সৃষ্টি, আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি এবং জীবনমান উন্নয়নে খেলাধুলার গুরুত্বকে মেসি বিশেষভাবে গুরুত্ব দিয়েছেন। বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণকারীদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে তাঁদের উৎসাহও দিয়েছেন তিনি।

স্বাস্থ্য গবেষণায় সহায়তা

স্বাস্থ্য ও চিকিৎসাবিজ্ঞানের গবেষণাতেও মেসির ফাউন্ডেশনের অবদান রয়েছে। বিশেষ ধরনের টিউমার নিয়ে গবেষণার জন্য তাঁর ফাউন্ডেশন অর্থায়ন করেছে। এ ধরনের গবেষণা ভবিষ্যতে জটিল রোগের চিকিৎসা ও আক্রান্ত রোগীদের জীবনমান উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

নিরহংকারী মেসি

লিওনেল মেসি বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম সেরা মহাতারকা হওয়া সত্ত্বেও মাঠ ও মাঠের বাইরে তাঁর বিনম্র ও সাধারণ জীবনযাপনের জন্য বিশ্বজুড়ে “নিরহংকারী মেসি” হিসেবে ব্যাপকভাবে পরিচিত। তিনি কেবল নিজের গোলের পেছনে ছোটেননি, বরং সতীর্থদের দিয়ে গোল করাতেও সমান আনন্দ পেতেন। মাঠে পেনাল্টি বা ফ্রি-কিক নেওয়ার সুযোগ অনেক সময় তরুণ বা ফর্মে ফিরতে চাওয়া সতীর্থদের নির্দ্বিধায় ছেড়ে দেন। প্রতিপক্ষের খেলোয়াড়দের কাছ থেকে কড়া ট্যাকল বা উস্কানির শিকার হলেও তিনি সাধারণত মেজাজ হারাননি এবং মাঠে কোনো অপ্রীতিকর বিবাদে জড়ানো থেকে নিজেকে বিরত রাখেন। ম্যাচ শেষে প্রতিপক্ষের খেলোয়াড় ও কোচদের সঙ্গে হাত মেলানো এবং জার্সি বদল করার মাধ্যমে সর্বদা সৌজন্যতা বজায় রাখেন। এত বিশাল খ্যাতি এবং অর্থ থাকা সত্ত্বেও মেসি তাঁর শৈশবের ভালোবাসা আন্তোনেলা রোকুজ্জো এবং তাঁদের সন্তানদের নিয়ে অত্যন্ত সাধারণ ও লাইমলাইট-মুক্ত পারিবারিক জীবন কাটাতে পছন্দ করেন। খুদে ভক্ত থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ যখনই তাঁর অটোগ্রাফ বা সেলফির জন্য এগিয়ে আসে, তিনি হাসিমুখে তা পূরণ করেন।

মেসির কাছে সাফল্য শুধু ট্রফি কিংবা রেকর্ডে সীমাবদ্ধ নয়। নিজের খ্যাতি ও সম্পদকে মানুষের কল্যাণে কাজে লাগানোর মধ্যেও তিনি সাফল্যের অর্থ খুঁজে নিয়েছেন। তাই ফুটবল মাঠে তিনি যেমন কিংবদন্তি, মাঠের বাইরেও তেমনি মানবিকতার এক উজ্জ্বল উদাহরণ। মেসি শুধু ফুটবলের মহানায়ক নন—তিনি অসহায় মানুষের জন্য মানবিক একটি নাম।

লেখক
কর্নেল ডাঃ নাজমুল হুদা খান (অব.)

পরিচালক, মেডিক্যাল সার্ভিসেস, বিআরবি হাসপাতাল