বিশেষ প্রতিবেদন:
কুমিল্লা বিভাগ হচ্ছে, হবে এমন আশ্বাস শুনতে শুনতে ক্লান্ত কুমিল্লার জনগণ। কুমিল্লাকে বিভাগ করা নিয়ে এত আলোচনা, এত বাহানা। উপমহাদেশের প্রাচীণ জনপদ কুমিল্লাকে কেন অবহেলা করা হচ্ছে ? কুমিল্লার এত মন্ত্রী – সাংসদ তারাই বা কেন এক সাথে এ দাবিতে সোচ্ছার হচ্ছে না ? একজন দুইজন দাবি তুললে অন্যরা কেন সেই দাবির সাথে এক হতে পারছে না ? কেন তারা কুমিল্লা বিভাগের দাবির প্রশ্নে নিস্ক্রিয় থাকছে ? আবার বিভাগের নাম পাল্টে ময়নামতি নামে করার পক্ষে আছেন দুই একজন জনপ্রতিনিধি । কেন একটি উপজেলার একটি ইউনিয়নের নামে হবে কুমিল্লার বিভাগ ? এমন হাজারো প্রশ্নের অন্তরালে চাপা পড়ে আছে কুমিল্লার বিভাগ বাস্তবায়ন।
কুমিল্লা অনেক আগেই যৌক্তিকভাবে বিভাগ হওয়ার অন্যতম দাবিদার ছিল। কুমিল্লার যে ঐতিহ্য তাতে রংপুর, সিলেট, ময়মনসিংহের আগেই কুমিল্লা বিভাগ হওয়ার দাবিদার। সরকার যেভাবে প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ করছে, তাতে পূর্বাঞ্চলে একটি নতুন বিভাগ করা যেতেই পারে। আর তার জন্য রাজধানী ঢাকা আর বাণিজ্যিক রাজধানী চট্টগ্রামের ঠিক মাঝখানে শিক্ষা-সংস্কৃতি-যোগাযোগের কেন্দ্রে থাকা প্রাচীন জনপদ কুমিল্লার চেয়ে ভালো কোনো বিকল্প নেই। কিন্তু তারপরেও নানা ইস্যু, না বাহানার ছলে কুমিল্লা এখনো বিভাগ বঞ্চিত।
এক সময় অবিভক্ত ভারতের শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি-অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র ছিল কুমিল্লা। গোমতী-মেঘনা-তিতাস-ডাকাতিয়া বিধৌত কুমিল্লা একসময় অবিভক্ত ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের রাজধানীও ছিল। বাংলাদেশ শুধু নয়, এই অঞ্চলের সবচেয়ে প্রাচীন জনপদের একটি কুমিল্লা। এই জনপদের স্তরে স্তরে লুকিয়ে আছে হাজার বছরের ঐতিহ্য। কুমিল্লার আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে নজরুলের অনেক স্মৃতি। এই শহরে নজরুল ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন করেছেন, এই শহরে নজরুল হাঁটতেন, এখানে বসে নজরুল কবিতা লিখতেন, এখানে আড্ডা মারতেন, এই কুমিল্লার বাতাসে ভেসে আসে উপমহাদেশের সংগীত সাধক শচীন দেব বর্মণের কণ্ঠ । এখানে এসেছেন অহিংসার বাণী নিয়ে ভারতবর্ষের মহান নেতা মহাত্মা গান্ধী। বিশ^কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পদধূলিতে ধন্য হয়েছে এই কুমিল্লা। বুদ্ধদেব বসুর জন্ম কুমিল্লায়। ওস্তাদ আয়েত আলী খাঁ’দের সেতার ঝঙ্কার তুলেছে কুমিল্লার বাতাসে। পাকিস্তান গণপরিষদে প্রথম বাংলা ভাষার প্রস্তাবক ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত কুমিল্লার সন্তান। বাংলাকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা করার অন্যতম সহযোদ্ধা রফিকুল ইসলামও কুমিল্লার। এখানে রয়েছে শতবর্ষের ঐতিহ্যে লালিত দেশের একমাত্র সার্ভে প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ সার্ভে ইনস্টিটিউট। কুমিল্লায় রয়েছে অষ্টম শতকে নির্মিত কোটবাড়ীর শালবন বৌদ্ধবিহারসহ প্রায় অর্ধশতাধিক প্রত্নসম্পদ। রয়েছে ময়নামতি জাদুঘর। আরো রয়েছে লালমাই পাহাড়,শাহ সুজা মসজিদ, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ওয়ার সিমেট্রি, নানা ঐতিহাসিক নিদর্শন রয়েছে যা আকর্ষণ করে ইতিহাসবিদ ও পর্যটকদের। এখানকার কোটবাড়িতে রয়েছে ড. আখতার হামিদ খানের আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ পল্লি উন্নয়ন একাডেমি (বার্ড), যেখানের সমবায় ধারণা আলোচিত বিশ^জুড়ে। কুমিল্লার খাদি শিল্প, তাঁত শিল্প, কুটির শিল্প, মৃৎ ও কারু শিল্প, রসমালাই, মিষ্টি, ময়নামতির শীতল পাটি সুনাম দেশজুড়ে। রসমালাই আর খাদির সুনাম তো বিশ্বজুড়ে । ভারতীয় সীমান্তবর্তী কুমিল্লার রাজেশপুরে রয়েছে ইকোপার্ক। কুমিল্লা ইপিজেড, কুমিল্লার বিবিরবাজার স্থলবন্দর, কৃষিক্ষেত্রে অভূতপূর্ব উন্নয়ন, দিদার সমবায় সমিতি, দাউদকান্দির প্লাবনভূমিতে মৎস্য চাষ এখানকার অর্থনৈতিক উন্নয়নে অসামান্য অবদান রেখে আসছে। সব মিলিয়ে দেশের অন্যান্য জেলার চেয়ে কুমিল্লা অনেক বেশি সমৃদ্ধ। এই কুমিল্লাকে বলা হতো ব্যাংক আর ট্যাংকের শহর। যদিও অনেক দীঘি-পুকুর ভরাট করে ফেলেছে ভূমিদস্যুরা। তবু এখনও ঐতিহ্যে ভরপুর ধর্মসাগর, রাণীর দীঘি, নানুয়ার দীঘির মত অনেক জলাশয় টিকে আছে। একসময় অবিভক্ত ভারতের ব্যাংকিং আর সমবায়ের প্রাণকেন্দ্র ছিল কুমিল্লা।
কুমিল্লায় সরকারের প্রায় সব ধরনের প্রতিষ্ঠান রয়েছে। একটি পরিপূর্ণ আবাসিক জেলা হিসেবে কুমিল্লার সুনাম রয়েছে। ভৌগোলিক ও উন্নত যোগাযোগব্যবস্থার কারণে কুমিল্লা খুবই সমৃদ্ধ জনপদ। এ ছয় জেলার মানুষের সঙ্গে সড়ক, রেল ও নদীপথে যোগাযোগ অত্যন্ত মসৃণ। দাপ্তরিক বেশির ভাগ কাজেই ছয় জেলার মানুষ কুমিল্লায় জড়ো হন। এখানে দিনে এসে দিনে কাজ করে বাড়ি ফিরে যাওয়া সম্ভব। ছয় জেলার মানুষের আঞ্চলিক ভাষাও কাছাকাছি। কুমিল্লা সবকিছুতেই অগ্রসরমাণ। কুমিল্লায় সিটি করপোরেশন ও শিক্ষা বোর্ডসহ সরকারের অনেকগুলো দপ্তরের বিভাগীয় কার্যালয় এখানে বিদ্যমান রয়েছে। কুমিল্লায় সরকার আইটি ভিলেজ করার উদ্যোগ নিয়েছে। কিন্তু নানা কারণে কুমিল্লা অবহেলার পাত্রেই রূপ নিয়েছে।
প্রাচীনকালে সমতট জনপদের অন্তর্গত ছিল কুমিল্লা এবং পরবর্তীতে এটি ত্রিপুরা রাজ্যের অংশ হয়েছিল। কুমিল্লা নামকরণের অনেকগুলো প্রচলিত মতের মধ্যে মোটামুটি গ্রহণযোগ্য তথ্য পাওয়া যায় চৈনিক পরিব্রাজক ওয়াং চোয়াঙ কর্তৃক সমতট রাজ্য পরিভ্রমণের বৃত্তান্ত থেকে। তার বর্ণ