All posts by jitu

নাকচ হওয়া আবেদন গোপন রেখে নতুন আবেদন, তদন্ত কমিটি করল বিপিসি

বিশেষ প্রতিনিধি:

সুপার পেট্রোকেমিক্যালের রিফাইনারি পরিচালনার অনুমতি চেয়ে করা আগের আবেদন নাকচ হওয়ার তথ্য গোপন রেখে প্রতিষ্ঠানটি নতুন করে আবেদন করেছে—এমন অভিযোগের মধ্যে বিষয়টি খতিয়ে দেখতে ছয় সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)। তবে কমিটি গঠনের জন্য বিপিসির পর্ষদে উপস্থাপিত নোটেও আগের আবেদন নাকচের বিষয়টি উল্লেখ করা হয়নি। বরং ওই নোট প্রস্তুতকারী কর্মকর্তাকেই করা হয়েছে তদন্ত কমিটির সদস্য সচিব।

মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট) বিপিসির সচিব ও সরকারের উপসচিব শাহিনা সুলতানার সই করা এক অফিস আদেশে কমিটি গঠন করা হয়। কমিটিকে সুপার পেট্রোকেমিক্যালের প্ল্যান্ট পরিদর্শন করে প্রতিষ্ঠানটির প্রসেসিং সক্ষমতা বৃদ্ধি ও প্রকল্পের অগ্রগতি সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করে সাত দিনের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে।

বিপিসির সচিব শাহিনা সুলতানা বলেন, ‘অপারেশন বিভাগ থেকে নোট অনুমোদন হয়েছে। তারাই কমিটির সদস্য নির্ধারণ করে নোট উপস্থাপন করেছে। নোট অনুমোদন হওয়ার পর কমিটি গঠন করা হয়েছে। কয়েকটি মিডিয়ার প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে সাত দিনের মধ্যে কমিটিকে রিপোর্ট দিতে বলা হয়েছে।’

পর্ষদে উপস্থাপিত নোটে তথ্য গোপনের অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘বিষয়টি আমি জানি না। অনুমোদন হওয়ার পর আমি নিয়ম অনুযায়ী কমিটি গঠনের অফিস আদেশ করেছি।’

বিপিসির আদেশ অনুযায়ী, ঊর্ধ্বতন মহাব্যবস্থাপক (হিসাব) এ টি এম সেলিমকে কমিটির আহ্বায়ক করা হয়েছে। সদস্য সচিব করা হয়েছে বিপিসির বাণিজ্য ও অপারেশন শাখার উপ-ব্যবস্থাপক তানজিন হোসেনকে। কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন—বিপিসির মহাব্যবস্থাপক (অর্থ) মোরশেদ হোসাইন আজাদ, মহাব্যবস্থাপক (বণ্টন ও বিপণন) ফেরদৌসী মাসুম হিমেল, মহাব্যবস্থাপক (বাণিজ্য ও অপারেশন্স) জাহিদ হোসাইন এবং ইস্টার্ন রিফাইনারি পিএলসির উপমহাব্যবস্থাপক (প্ল্যানিং অ্যান্ড শিপিং) মো. মাসুদুল আলম।

অফিস আদেশে বলা হয়েছে, কমিটি সংশ্লিষ্ট সংবাদ প্রতিবেদন পর্যালোচনার পাশাপাশি সুপার পেট্রোকেমিক্যালের প্ল্যান্ট সরেজমিনে পরিদর্শন করবে। এরপর প্ল্যান্টের প্রসেসিং ক্ষমতা বৃদ্ধি ও প্রকল্পের অগ্রগতি সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্যসহ প্রতিবেদন বিপিসির চেয়ারম্যানের কাছে জমা দেবে।

কমিটি গঠনের আদেশের সঙ্গে গণমাধ্যমে প্রকাশিত ‘আবেদন নাকচের পরেও রিফাইনারি বানাচ্ছে সুপার পেট্রোকেমিক্যাল’ শিরোনামের প্রতিবেদনের পাশাপাশি কয়েকটি গণমাধ্যমের প্রতিবেদনও সংযুক্ত করা হয়েছে।

তবে বিপিসির পর্ষদে কমিটি গঠনের জন্য উপস্থাপিত নোট পর্যালোচনায় দেখা যায়, সেখানে সুপার পেট্রোকেমিক্যালের আগের আবেদন নাকচ হওয়ার গুরুত্বপূর্ণ তথ্যটি উল্লেখ করা হয়নি। অথচ নোটে প্রতিষ্ঠানটির ২০২৪ সালের আবেদন, পরবর্তী সময়ে বিপিসির তদন্ত কমিটি গঠন এবং ২০২৫ সালের এপ্রিলে সেই কমিটির প্রতিবেদন জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগে পাঠানোর বিষয়গুলো উল্লেখ রয়েছে।

নোটে বলা হয়, সুপার পেট্রোকেমিক্যাল ২০২৪ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর ‘বেসরকারি পর্যায়ে রিফাইনারি স্থাপন, অপরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানিপূর্বক মজুত, প্রক্রিয়াকরণ, পরিবহন ও বিপণন নীতিমালা-২০২৩’-এর আলোকে বিদ্যমান রিফাইনারি হিসেবে অপরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি, মজুত ও প্রক্রিয়াকরণের মাধ্যমে উৎপাদিত জ্বালানি তেল নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় বিপণনের অনুমতি চেয়ে আবেদন করে।

ওই আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের নির্দেশনায় বিপিসি একটি কমিটি গঠন করে। ২০২৪ সালের ২৩ অক্টোবর তৎকালীন মহাব্যবস্থাপক (বণ্টন ও বিপণন) জাহিদ হোসাইনকে আহ্বায়ক করে ছয় সদস্যের ওই কমিটি গঠন করা হয়। পরে ইস্টার্ন রিফাইনারির একজন কর্মকর্তাকে কমিটিতে কো-অপ্ট করা হয়।

২০২৫ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি কমিটির সদস্যরা কর্ণফুলী নদীর দক্ষিণ পাড়ের জুলধা ইউনিয়ন এলাকায় অবস্থিত সুপার পেট্রোকেমিক্যালের সিআরইউ প্ল্যান্ট ও প্রস্তাবিত প্রকল্প এলাকা পরিদর্শন করেন। পরিদর্শন ও আবেদন পর্যালোচনার পর সাত সদস্যের কমিটি ৮ এপ্রিল বিপিসির চেয়ারম্যানের কাছে প্রতিবেদন জমা দেয়। পরে ২০ এপ্রিল ওই প্রতিবেদন জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগে পাঠানো হয়।

এরপর ২০২৫ সালের ১৬ নভেম্বর জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের অপারেশন-১ শাখা থেকে সুপার পেট্রোকেমিক্যালের ব্যবস্থাপনা পরিচালককে চিঠি দিয়ে প্রতিষ্ঠানটির ২০২৪ সালের ২৫ সেপ্টেম্বরের আবেদন নাকচের সিদ্ধান্ত জানানো হয়।

আবেদনটি নাকচ হওয়ার আড়াই মাস পর, ২০২৬ সালের ২৯ জানুয়ারি বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের সচিব বরাবর নতুন করে আবেদন করেন সুপার পেট্রোকেমিক্যালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ মোস্তফা হায়দার।

নতুন আবেদনে বলা হয়, সুপার পেট্রোকেমিক্যাল ইউরো-৫ মানের পেট্রোলিয়াম পণ্য উৎপাদনের জন্য বছরে ১৫ লাখ মেট্রিক টন ক্ষমতাসম্পন্ন ক্রুড অয়েল রিফাইনারি স্থাপন করছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হলে প্রতিষ্ঠানটির বার্ষিক উৎপাদন ক্ষমতা দাঁড়াবে ১৫ লাখ ৪৬ হাজার ৩৮১ মেট্রিক টন। রিফাইনারিতে ক্রুড ডিস্টিলিয়েশন ইউনিটের পাশাপাশি ডিজেল হাইড্রোট্রিয়েটার, রিসিডিউ ডিসালফারাইজেশন এবং আইসোমারাইজেশন ইউনিট স্থাপনের কথাও আবেদনে উল্লেখ করা হয়।

তবে এই দ্বিতীয় আবেদনে আগের আবেদন নাকচ হওয়ার কোনো উল্লেখ নেই। এমনকি ২০২৪ সালের আবেদনের সূত্রও এতে দেওয়া হয়নি।

নতুন আবেদনের পর গত ৩ ফেব্রুয়ারি জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ বিপিসির কাছে মতামত চায়। এর পরিপ্রেক্ষিতে ৮ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত বিপিসির ১০১৭তম বোর্ড সভায় বিষয়টি পর্যালোচনা করা হয়। সভার কার্যবিবরণীতে আগের আবেদন নাকচ হওয়ার বিষয়টি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়।

কার্যবিবরণীতে বলা হয়, ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেডের (ইআরএল) ইউনিট-২ প্রকল্প ইতোমধ্যে অনুমোদিত হয়েছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে আগে বাস্তবায়িত এসপিএম প্রকল্পের পূর্ণ ব্যবহার নিশ্চিত করা সম্ভব হবে এবং সরকারি পর্যায়ে জ্বালানি তেল পরিশোধনের সক্ষমতা তিন গুণ বাড়বে।

এ কারণে নতুন করে সুপার পেট্রোকেমিক্যালকে অপরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি, মজুত, পরিবহন ও প্রক্রিয়াকরণের মাধ্যমে উৎপাদিত জ্বালানি তেল নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় বাজারজাতের অনুমতি দেওয়ার বিষয়টি আরও গভীরভাবে পর্যালোচনার প্রয়োজন রয়েছে বলে বোর্ড মত দেয়।

কার্যবিবরণীতে আরও উল্লেখ করা হয়, ২০২৫ সালের ১৬ নভেম্বর জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ সুপার পেট্রোকেমিক্যালের ২০২৪ সালের আবেদন নাকচ করেছিল। ওই সিদ্ধান্তের পেছনে কনডেনসেট নীতিমালা, ২০১৪-এর সংশ্লিষ্ট বিধানের কথাও উল্লেখ করা হয়। সেখানে বলা হয়েছিল, বেসরকারি পর্যায়ে স্থাপিত ফ্রাকশনেশন প্ল্যান্টের জন্য সংগৃহীত বা আমদানি করা কনডেনসেট প্রক্রিয়াজাত করে পাওয়া পেট্রোল, অকটেন, ডিজেল, কেরোসিন বা এলপিজি সরাসরি অভ্যন্তরীণ বাজারে বাজারজাত করা যাবে না।

অন্যদিকে, বিপিসির ২৩ আগস্টের নোট শিট এবং সুপার পেট্রোকেমিক্যালের দ্বিতীয় আবেদন পর্যালোচনা করে দেখা যায়, আগের আবেদন নাকচের তথ্য উভয় ক্ষেত্রেই অনুল্লেখিত রয়েছে। বিশেষ করে কমিটি গঠনের জন্য প্রস্তুত করা নোটে ২০২৪ সালের আবেদন ও পরবর্তী প্রক্রিয়ার কথা থাকলেও আবেদন নাকচের বিষয়টি তুলে ধরা হয়নি।

নোটটি প্রস্তুত করেন বিপিসির বাণিজ্য ও অপারেশন বিভাগের উপ-ব্যবস্থাপক তানজিন হোসেন। পরে একই বিভাগের ব্যবস্থাপক মো. ইসতিয়াক হোসেন ও বিভাগীয় প্রধান মহাব্যবস্থাপক মোহাম্মদ জাহিদ হোসাইন নোটে স্বাক্ষর করেন। এরপর পরিচালক (অপারেশন্স) এ কে মোহাম্মদ সামছুল আহসানের স্বাক্ষরের পর বিপিসির চেয়ারম্যানের অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব মনজুর আলম প্রধান নোটটি অনুমোদন করেন।

পর্ষদে উপস্থাপিত নোটে তথ্য গোপনের অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে তদন্ত কমিটির সদস্য সচিব তানজিন হোসেন বলেন, ‘সুপার পেট্রোকেমিক্যালের রিফাইনারি করার প্রথম আবেদন নাকচ হওয়ার বিষয়টি অন্য একটি গোপনীয় চিঠিতে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জ্ঞাত করা হয়েছে। তাই কমিটি গঠনের নোট শিটে বিষয়টি উল্লেখ করা হয়নি।’

তিনি আরও বলেন, ‘এখন কমিটি গঠন হয়েছে। কমিটি নিশ্চয়ই পুরো বিষয়গুলো পূর্ণাঙ্গ যাচাই-বাছাই করে প্রতিবেদন দেবে।’

এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে বিপিসির পরিচালক (অপারেশন্স) এ কে মোহাম্মদ সামছুল আহসানের মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও সেটি বন্ধ পাওয়া যায়। পরে বিপিসির চেয়ারম্যানের অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা মনজুর আলম প্রধানের ব্যক্তিগত ও দাপ্তরিক নম্বরে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি সাড়া দেননি। হোয়াটসঅ্যাপে পাঠানো বার্তারও কোনো জবাব পাওয়া যায়নি।

এখন গঠিত ছয় সদস্যের কমিটি সংবাদ প্রতিবেদন পর্যালোচনার পাশাপাশি সুপার পেট্রোকেমিক্যালের প্ল্যান্ট সরেজমিনে পরিদর্শন করে প্রকল্পের বাস্তব অগ্রগতি, প্রসেসিং সক্ষমতা এবং রিফাইনারি স্থাপনের কার্যক্রম যাচাই করবে। সাত দিনের মধ্যে কমিটির প্রতিবেদন জমা দেওয়ার কথা রয়েছে।

চৌদ্দগ্রামে সিএনজি চালক বিল্লাল হত্যা মামলার প্রধান আসামি গ্রেফতার

ডেস্ক রিপোর্ট:

কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামে জায়গা সংক্রান্ত বিরোধের জেরে দুই পক্ষের সংঘর্ষে সিএনজি অটোরিকশা চালক বিল্লাল হোসেন হত্যা মামলার প্রধান আসামী মোজাম্মেল হোসেনকে চট্টগ্রাম থেকে গ্রেফতার করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। মোজাম্মেল উপজেলার শ্রীপুর ইউনিয়নের গজারিয়া গ্রামের জয়নাল আবেদীনের ছেলে।

বুধবার (২৬ আগস্ট) দুপুরে তথ্যটি নিশ্চিত করেছেন থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোহাম্মদ আরিফ হোছাইন।

জানা যায়, শ্রীপুর ইউনিয়নের গজারিয়া গ্রামে গত ২৪ জুলাই বিরোধের জেরে জয়নাল আবেদীনের পরিবার রাস্তার ওপর বাঁশের খুঁটি দিয়ে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। বিষয়টি জানতে পেরে বিল্লাল হোসেনসহ পরিবারের সদস্যরা বাধা সরাতে গেলে উভয় পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। এ সময় জয়নাল আবেদীনের ছেলে মোজাম্মেল হোসেনের ধারালো অস্ত্র দিয়ে বিল্লাল হোসেনের মাথায় আঘাত করেন বলে তাদের অভিযোগ। গুরুতর আহত অবস্থায় বিল্লালকে প্রথমে কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরে অবস্থার অবনতি হলে তাকে কুমিল্লা টাওয়ার হাসপাতালে স্থানান্তর করে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) রাখা হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৪ আগস্ট মঙ্গলবার রাতে বিল্লাল হোসেনের মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় এজাহার নামীয় প্রধান আসামী মোজাম্মেল হোসেনকে মঙ্গলবার রাতে চট্টগ্রামের চাঁন্দগাঁও এলাকা থেকে গ্রেফতার করে পুলিশ ও র‌্যাব-৭ এর যৌথ টিম।

চৌদ্দগ্রাম মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোহাম্মদ আরিফ হোছাইন জানান, চট্টগ্রামের চাঁন্দগাঁও এলাকায় অভিযান চালিয়ে হত্যামামলার আসামী মোজাম্মেল হোসেনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। অপরাধ দমনে পুলিশের অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

 

কুমিল্লায় ছোট ভাইকে পিটিয়ে হত্যার অভিযোগ বড় ভাইয়ের বিরুদ্ধে

ডেস্ক রিপোর্ট:

কুমিল্লার বুড়িচংয়ে মাদক নিয়ে বিরোধের জেরে ছোট ভাই জাকিরকে পিটিয়ে হত্যার অভিযোগ উঠেছে বড় ভাই মো: শাকিল (৩২) ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে।

মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট) রাতে উপজেলার মোকাম ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের কাকিয়ারচর পশ্চিমপাড়ায় এ ঘটনা ঘটে।

নিহত জাকির ওই এলাকার বাসিন্দা আইয়ুব আলীর ছেলে।

জানায় যায়, পারিবারিক বিভিন্ন বিষয় নিয়ে জাকির ও তার বড় ভাই শাকিলের মধ্যে প্রথমে কথা-কাটাকাটি হয়। একপর্যায়ে তা মারামারিতে রূপ নেয়। এ সময় জাকিরকে বেধড়ক মারধর করা হয়। এতে তিনি গুরুতর আহত হয়ে অচেতন হয়ে পড়েন। পরে তার মৃত্যু হয়।

পুলিশের প্রাথমিক তথ্যমতে, নিহতের মাথার পেছনে আঘাতের চিহ্ন, দুই পায়ে ধারালো অস্ত্রের আঘাত এবং কপালে কাটা জখম রয়েছে। পুলিশ লাশ উদ্ধার করে সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করেছে। ময়নাতদন্তের জন্য লাশ মর্গে পাঠানো হয়েছে।

পুলিশ প্রাথমিকভাবে ধারণা করছে, মাদক ব্যবসার টাকা-পয়সা সংক্রান্ত বিষয়কে কেন্দ্র করেই ঘটনার সূত্রপাত হয়ে থাকতে পারে। তবে তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না।

দেবপুর পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ (পরিদর্শক) সুরেজীত বড়ুয়া জানান, ঘটনার প্রাথমিক তদন্ত চলছে। লাশের সুরতহাল রিপোর্ট প্রস্তুত করা হয়েছে। ময়নাতদন্ত ও আইনগত প্রক্রিয়া শেষে তদন্ত সাপেক্ষে ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।

দাউদকান্দিতে গাঁজাসহ দুই নারী মাদক পাচারকারী আটক

জাকির হোসেন হাজারী, দাউদকান্দি:

দাউদকান্দিতে ৭কেজি গাঁজাসহ দুই নারী মাদক পাচারকারীকে আটক করেছে পুলিশ।

বুধবার(২৬আগষ্ট) দুপুর বারটায় ঢাকা-চট্রগ্রাম মহাসড়কের দাউদকান্দি টোলপ্লাজার পশ্চিম পাশে স্কেল সংলগ্ন এলাকা থেকে তাদের আটক করা হয়।

আটককৃতরা হলেন, মুন্সিগঞ্জ জেলার বিক্রমপুর গ্রামের সালাউদ্দিন ইসলামের মেয়ে সায়মা আক্তার(১৯) ও কুমিল্লা জেলার ব্রাহ্মনপাড়া উপজেলার কান্দোঘর গ্রামের আব্দুল বারেকের মেয়ে সুমি আক্তার(২৪)।

দাউদকান্দি মডেল থানার ওসি সাজেদুল ইসলাম জানান, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে দাউদকান্দি টোলপ্লাজা এলাকায় অস্থায়ী চেকপোস্ট বসিয়ে দিবাকালীন যানবাহনে তল্লাশি চালানো হয়।

এ সময় ঢাকাগামী যাত্রীবাহী বাসের যাত্রী দুই নারীকে সন্দেহজনক ভাবে বাস থেকে নামানো হয়। পরে মহিলা পুলিশ দিয়ে তল্লাশী করে বিশেষ কৌশলে তাদের শরীরে পেঁচিয়ে রাখা স্কচটেপ দিয়ে মোড়ানো সাত কেজি গাঁজা উদ্ধার করা হয়। আটককৃতদের বিরুদ্ধে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে মামলা প্রক্রিয়াধীন।

দক্ষ জনশক্তি তৈরির জন্য চীনের কারিগরি শিক্ষা সহযোগিতা চাইলেন শিক্ষামন্ত্রী

শেখ ফরিদ উদ্দিন:

শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন আজ চীনের গুয়াংজুতে “চায়না বাংলাদেশ এডুকেশন কো পারেশন লাঞ্চ, এ প্রধান অতিথি হিসেবে অংশগ্রহণ করেছেন।

অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের মেধাবী শিক্ষার্থীদের জন্য চীনে পড়াশোনার সুযোগ বৃদ্ধি, চীন ও বাংলাদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে সহযোগিতা কাঠামো গড়ে তোলা, দুই দেশের গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর যৌথ উদ্ভাবন এবং দক্ষ জনশক্তি তৈরির জন্য চীন–বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা সহযোগিতার বিষয়ে আলোচনা করা হয়।

এছাড়াও, দক্ষ জনশক্তি উন্নয়ন এবং দুই দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের মাঝে পারস্পরিক সহযোগিতার ওপর গুরুত্ব দিয়ে যৌথ পরিকল্পনার বিষয়েও বিস্তারিত আলোচনা করা হয়। অনুষ্ঠানে আসা প্রকাশ করা হয় যে, চীন–বাংলাদেশ শিক্ষা সহযোগিতা নতুন উচ্চতায় পৌঁছাবে।

অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা উপদেষ্টা ড. মাহদী আমিন এবং কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের সচিব মোঃ দাউদ মিয়া বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন।

অনুষ্ঠানে চীনের আনহুই নরমাল ইউনিভার্সিটির ভাইস প্রেসিডেন্ট তিয়ান জিংইউ, জিয়াংসি সাইন্স এন্ড টেকনোলজি নর্মাল ইউনিভার্সিটির ভাইস প্রেসিডেন্ট জেং পেংগ উ সহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ঊর্ধ্বতন প্রতিনিধিবৃন্দ অংশগ্রহণ করেন।

২৭৫ কনটেইনারে যন্ত্রপাতি, বন্দরে আটকে তিন বছর

বিশেষ প্রতিনিধি:

 

ব্যক্তি স্বার্থের চেয়ে দেশের স্বার্থ অনেক বড়। দায়িত্বে থাকা কিছু ব্যক্তি হিংসা ও লোভের কারণে দেশ ও জনগণের ব্যাপক ক্ষতি করে ফেলেন। এমনই এক ঘটনার শিকার হয়েছে একটি স্টিল মিলস।

 

খবরে জানা গেছে, রোষানলে পড়ে একটি স্টিল মিলস উৎপাদনে যাওয়ার আগেই প্রায় ২ হাজার ৯৫৮ কোটি টাকা লোকসানের মুখে পড়েছে। ওই শিল্পপ্রতিষ্ঠান দাঁড় করাতে বিনিয়োগ হয়েছে হাজার হাজার কোটি টাকা। বন্দরে এসেছে প্রায় ৫০০ কোটি টাকার আমদানি করা যন্ত্রপাতি। ২৭৫ কনটেইনারে থাকা সেই যন্ত্রপাতি কারখানায় পৌঁছানোর আগেই আটকে যায় দীর্ঘ সময়ের জন্য। এর মধ্যে জমেছে বন্দর ও শিপিং ড্যামেজ, বেড়েছে ব্যাংকঋণের সুদ, বেড়েছে ডলারের মূল্য এবং প্রকল্প ব্যয়।

 

এটি মিরসরাই অর্থনৈতিক অঞ্চলে নির্মাণাধীন বসুন্ধরা মাল্টি স্টিল ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের (বিএমএসআইএল) মেগা স্টিল প্রকল্প। বছরে প্রায় সাড়ে ১২ লাখ টন স্টিল উৎপাদনের সক্ষমতা নিয়ে গড়ে ওঠার কথা এই কারখানাটির। প্রকল্পটি চালু হলে সরাসরি প্রায় সাত হাজার এবং পরোক্ষভাবে প্রায় এক লাখ মানুষের কর্মসংস্থান হওয়ার কথা। একই সঙ্গে বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো রিবার কয়েল ও ওয়্যার রড উৎপাদনের মাধ্যমে আমদানিনির্ভরতা কমানোর পরিকল্পনাও ছিল।

 

কিন্তু নির্ধারিত সময় ২০২৪ সালে কমিশনিং তো দূরের কথা, ২০২৬ সালের আগস্টও প্রায় শেষ। এখন আশা করা হচ্ছে, সব জটিলতা কাটিয়ে কাজ এগোলে ২০২৭ সালের শেষ নাগাদ কারখানাটি উৎপাদনে যেতে পারে।

 

প্রকল্পসংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালে মিরসরাই বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে প্রায় ৭০ একর জমির ওপর বিএমএসআইএলকে এই স্টিল কারখানা নির্মাণের অনুমোদন দেওয়া হয়। উন্নত প্রযুক্তি ও তুলনামূলক কম পরিচালন ব্যয়কে সামনে রেখে প্রকল্পটির নকশা করা হয়। লক্ষ্য ছিল উচ্চমানের স্টিল উৎপাদনের পাশাপাশি কার্বন নিঃসরণও কমানো।

 

ক্যাপিটাল মেশিনারি আমদানির জন্য ওই সময় কয়েকটি ব্যাংকের সিন্ডিকেটেড টার্ম লোনের মাধ্যমে প্রায় ৫৫০ কোটি টাকার এলসি খোলা হয়। পরবর্তী সময়ে প্রায় ৫০০ কোটি টাকার যন্ত্রপাতি ২৭৫ কনটেইনারে করে দেশে আসে।

 

কিন্তু যন্ত্রপাতি আসার পরই তৈরি হয় নতুন জটিলতা। বিএমএসআইএল সূত্রের দাবি, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একটি নির্দেশনার কারণে বসুন্ধরা নামধারী বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে একই ঋণগ্রহীতা হিসেবে বিবেচনা করে এলসির ডকুমেন্ট আটকে দেওয়া হয়। ফলে বন্দরে পড়ে থাকে একের পর এক কনটেইনার।

 

কনটেইনারগুলো পড়ে থাকার কারণে শুধু বন্দর ও শিপিং-সংক্রান্ত ড্যামারেজই বাড়তে বাড়তে প্রায় ৯৫০ কোটি টাকায় পৌঁছায় বলে প্রকল্পসংশ্লিষ্টদের দাবি। অর্থাৎ যন্ত্রপাতির আমদানি মূল্য যেখানে প্রায় ৫০০ কোটি টাকা, সেখানে পরবর্তী সময়ে শুধু ড্যামারেজ ও সংশ্লিষ্ট ব্যয়ই তার চেয়ে অনেক বেশি হয়ে যায়।

 

প্রকল্পটির আর্থিক সংকটের শুরু অবশ্য আরও আগে। ২০২২ সালে যখন এলসিগুলো খোলা হয়, তখন ডলারের দাম ছিল প্রায় ৮৪ থেকে ৮৬ টাকা। ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের প্রভাবে পরবর্তী সময়ে ডলারের মূল্য উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায় এবং টাকার প্রায় ৪০ শতাংশ অবমূল্যায়ন ঘটে।

 

ব্যাংকগুলো ২০২২-২৩ সালের মধ্যেই বিদেশি সরবরাহকারীদের পাওনা পরিশোধ করে। তবে ৩৬০ দিনের পেমেন্ট সুবিধা থাকায় তখন বিএমএসআইএলের কাছ থেকে অর্থ আদায় করা হয়নি। ২০২৪ সালের শুরুতে এসে ব্যাংকগুলো বিএমএসআইএলের কাছে এককালীন প্রায় ৮৫০ কোটি টাকা দাবি করে।

 

প্রকল্পসংশ্লিষ্টদের হিসাবে, প্রায় ৫০০ কোটি টাকার যন্ত্রপাতির বিপরীতে মুদ্রার অবমূল্যায়ন ও মূল্যস্ফীতির কারণে অতিরিক্ত প্রায় ৮৫০ কোটি টাকার দায় তৈরি হয়। বিএমএসআইএল এই অর্থ পরিশোধের ব্যবস্থা করলেও ডকুমেন্ট হস্তান্তরের ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলো পরে আপত্তি জানায় বলে প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তাদের দাবি।

 

তাঁদের বক্তব্য, ওই সময় ডকুমেন্ট হস্তান্তর করা হলে কনটেইনারগুলো কাস্টমস থেকে ছাড়িয়ে যন্ত্রপাতি কারখানায় নেওয়া সম্ভব হতো। কিন্তু তা না হওয়ায় প্রকল্পটি আরও পিছিয়ে যায়।

 

বিএমএসআইএলের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, এলসিগুলো কাঁচামালের জন্য নয়, ক্যাপিটাল মেশিনারি আমদানির জন্য খোলা হয়েছিল। তাঁর মতে, কাঁচামাল আমদানি করে কয়েক মাসের মধ্যে উৎপাদন ও বিক্রির মাধ্যমে দায় পরিশোধ করা সম্ভব হলেও একটি রোলিং মিলের ক্ষেত্রে বিষয়টি সম্পূর্ণ ভিন্ন।

 

তিনি বলেন, এটি ছিল একটি প্রি-রেভিনিউ প্রকল্প। তাই এ ধরনের চার্জ আরোপ প্রচলিত প্রকল্প অর্থায়ন ব্যবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল না। তাঁর দাবি, পরবর্তী ১৩ মাসে যে ড্যামারেজ জমেছে, তা মুদ্রার অবমূল্যায়ন বা বিএমএসআইএলের কোনো কর্মকাণ্ডের কারণে হয়নি।

 

প্রকল্পসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দাবি, ব্যাংকের দাবি করা অর্থের ব্যবস্থা করার পরও ডকুমেন্ট না পাওয়ায় কনটেইনারগুলো ছাড়ানো সম্ভব হয়নি। এর মধ্যেই বন্দর ও শিপিং ড্যামেজ প্রায় ৪০০ কোটি টাকায় পৌঁছে যায়। একই সঙ্গে ঋণের সুদও বাড়তে থাকে।

 

২০২৬ সালের এপ্রিলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশে অগ্রণী ব্যাংককে বিএমএসআইএলকে ওই নির্দেশনা থেকে পৃথকভাবে বিবেচনার কথা জানানো হয় বলে সংশ্লিষ্টরা জানান। তবে তত দিনে প্রকল্পটির ওপর বড় ধরনের আর্থিক চাপ তৈরি হয়ে গেছে।

 

প্রকল্পটির অর্থায়নে অগ্রণী ব্যাংকের নেতৃত্বে আটটি ব্যাংকের একটি কনসোর্টিয়াম গঠন করা হয়। এতে অগ্রণী ব্যাংকের সঙ্গে সোনালী ব্যাংক, জনতা ব্যাংক, রূপালী ব্যাংক, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক, ব্যাংক এশিয়া ও এসবিএসি রয়েছে।

 

এই কনসোর্টিয়াম মোট ২ হাজার ৩৫০ কোটি টাকার সিন্ডিকেটেড টার্ম লোন অনুমোদন করে। এর মধ্যে ছাড় হয়েছে মাত্র ৫৭৬ কোটি টাকা, যা অনুমোদিত ঋণের ২৪ দশমিক ৫১ শতাংশ। বাকি ১ হাজার ৭৭৪ কোটি টাকা এখনো ব্যাংকগুলোর কাছেই রয়েছে।

 

৩০ জুন ২০২৬ পর্যন্ত প্রকল্পটির সুদ ও আবগারি শুল্ক দাঁড়িয়েছে ৮৫৮ কোটি টাকা। এর মধ্যে সিন্ডিকেটেড ঋণের বিতরণকৃত অংশের ওপর ২৪৬ কোটি এবং ‘ফোর্সড লোনের’ ওপর ৬১১ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। এ ব্যয় এখনো বাড়ছে।

 

বিএমএসআইএল এ পর্যন্ত ৪১১ কোটি টাকা পরিশোধ করেছে বলে জানা গেছে। প্রতিষ্ঠানটির স্পন্সর ইকুইটি ও অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে এই অর্থ দেওয়া হয়েছে।

 

প্রকল্পটি যখন হাতে নেওয়া হয়, তখন মোট বিনিয়োগের লক্ষ্যমাত্রা ছিল প্রায় ৪ হাজার ১৬০ কোটি টাকা। কিন্তু ডলারের মূল্যবৃদ্ধি, ঋণের সুদ, বিলম্ব এবং অন্যান্য আর্থিক চাপের কারণে এখন সেই ব্যয় বেড়ে প্রায় ৭ হাজার ১১৮ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে।

 

অর্থাৎ উৎপাদন শুরুর আগেই প্রকল্পটির ব্যয় প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকা বেড়ে গেছে।

 

বিএমএসআইএল কর্তৃপক্ষের হিসাবে, প্রকল্পটির ওপর তৈরি হওয়া প্রায় ২ হাজার ৯৫৮ কোটি টাকার আর্থিক চাপের প্রধান খাতগুলো হলো—নিষ্পত্তিকৃত এলসির বিপরীতে মুদ্রার অবমূল্যায়ন ও মূল্যস্ফীতিজনিত প্রায় ৮৫০ কোটি টাকা, বন্দর ড্যামেজ ও কনটেইনার ডিটেনশনসহ অন্যান্য ব্যয় প্রায় ৯৫০ কোটি টাকা, ৩০ জুন ২০২৬ পর্যন্ত ব্যাংকের সুদ ও আবগারি শুল্ক ৮৫৮ কোটি টাকা এবং ইউটিলিটি অবকাঠামো দ্রুত বাস্তবায়নে অতিরিক্ত ৩০০ কোটি টাকা।

 

প্রকল্পটির আরেকটি বড় সমস্যা ছিল গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানি সংযোগ। অর্থনৈতিক অঞ্চলের অভ্যন্তরে এসব ইউটিলিটি অবকাঠামো স্থাপনের দায়িত্ব সরকার ও বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের (বেজা) হলেও বিএমএসআইএলকে এ খাতেও বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয় করতে হয়েছে বলে প্রতিষ্ঠানটির দাবি।

 

প্রথম পর্যায়ে ৫০ বছরের জন্য গ্যাস, পানি ও বিদ্যুৎ সংযোগের উদ্দেশ্যে বসুন্ধরা প্রায় ২৯০ কোটি টাকা অগ্রিম পরিশোধ করে। পরে ইউটিলিটি সংযোগ দ্রুত বাস্তবায়নের জন্য বেজা পর্যাপ্ত অর্থ ও নির্দিষ্ট সময়সীমা দিতে না পারায় বিএমএসআইএল নিজস্ব অর্থে অবকাঠামো নির্মাণে আরও প্রায় ৩০০ কোটি টাকা ব্যয় করে।

 

এর মধ্যে বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইনে প্রায় ২৫০ কোটি, গ্যাস সংযোগে ৪০ কোটি এবং পানির লাইনে ১০ কোটি টাকা ব্যয় করা হয়েছে।

 

কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কম্পানি দৈনিক ৩ মিলিয়ন স্ট্যান্ডার্ড কিউবিক ফুট গ্যাস সরবরাহের অনুমোদন দেয়। বেজা ও বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডও পানি ও বিদ্যুৎ সংযোগ অনুমোদন করে। তবে সরবরাহ বাস্তবায়নের প্রয়োজনীয় ভৌত অবকাঠামো বিএমএসআইএলকেই নিজস্ব অর্থে নির্মাণ করতে হয়েছে বলে প্রকল্পসংশ্লিষ্টরা জানান।

 

এক কর্মকর্তা বলেন, ‘আমরা দুবার টাকা দিয়েছি। একবার মেয়াদের জন্য, আরেকবার দ্রুত বাস্তবায়নের জন্য। তারপরও এমন কারণে আমরা পিছিয়েছি, যা সম্পূর্ণভাবে আমাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে ছিল।’

 

বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএম) প্রেসিডেন্ট শওকত আজিজ রাসেল বলেন, একজন ব্যবসায়ীকে এককভাবে দায়ী করার সুযোগ তিনি দেখছেন না। তাঁর মতে, ডলারের দরের কারণে শিল্প খাতে বড় ধরনের লোকসান হয়েছে এবং ঋণ পরিশোধের সময়ও বাড়তি দরে ডলার কিনতে হচ্ছে।

 

অন্তর্বর্তী সরকারের সময় নীতি প্রণয়নে ঘাটতি ছিল বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তাঁর অভিযোগ, ওই সময়ে অর্থনীতি ও ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য কার্যকর নীতি গ্রহণ করা হয়নি এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক চুক্তির প্রভাবেও দেশীয় ব্যবসায়ীরা চাপে পড়েছেন।

 

তাঁর ভাষায়, অর্থনীতিতে অর্থের প্রবাহ কমে যাওয়ায় ব্যবসায়ীরা এখন অনেক বেশি সংকটে রয়েছেন। তিনি মনে করেন, একটি প্রাণবন্ত অর্থনীতির জন্য বাজারে অর্থের স্বাভাবিক সঞ্চালন জরুরি।

 

প্রকল্পসংশ্লিষ্টদের মতে, বিএমএসআইএল চালু হলে দেশের স্টিল খাতে বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে। বিশেষ করে রিবার কয়েল ও ওয়্যার রড দেশে উৎপাদিত হলে এসব পণ্যের আমদানিনির্ভরতা কমবে। এতে বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ের পাশাপাশি দেশীয় শিল্পের সরবরাহব্যবস্থাও শক্তিশালী হওয়ার সুযোগ রয়েছে।

 

প্রকল্পটির পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রতি টন রড উৎপাদনে প্রায় ৩ হাজার টাকা পর্যন্ত সাশ্রয় হতে পারে। উন্নত প্রযুক্তির কারণে তুলনামূলক কম পরিচালন ব্যয়ে উৎপাদন করা সম্ভব হবে বলেও সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন।

 

শিল্পসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ধারণা, সরবরাহ শৃঙ্খলার সীমাবদ্ধতা, বন্দর জট এবং কাঁচামালের দামের অস্থিরতা নিয়ন্ত্রণ করা গেলে দশকের দ্বিতীয়ার্ধে বাংলাদেশের স্টিল শিল্প বছরে ১১ থেকে ১৫ শতাংশ হারে প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে পারে।

 

তাঁদের মতে, বড় শিল্প প্রকল্প বাস্তবায়নে দেশীয় উদ্যোক্তারা যদি নীতিগত জটিলতা বা অনিশ্চয়তার কারণে বড় ধরনের লোকসানে পড়েন, তাহলে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছেও তা নেতিবাচক বার্তা দেবে। এতে ভবিষ্যৎ বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।

 

সাফওয়ান বসুন্ধরা গ্লোবাল-এসবিজির চিফ অপারেটিং অফিসার শাহেদ জাহিদ বলেন, উন্নত ও নিম্ন-নিঃসরণ প্রযুক্তি ব্যবহার করে দেশে রিবার কয়েল ও ওয়্যার রড উৎপাদনের লক্ষ্যেই প্রকল্পটিতে বিনিয়োগ করা হয়েছে। প্রচলিত উৎপাদন পদ্ধতির তুলনায় কম ব্যয়ে উচ্চমানের স্টিল উৎপাদনের পাশাপাশি কার্বন নিঃসরণ কমানোর লক্ষ্যও রয়েছে।

 

তিনি বলেন, প্রকল্পটি প্রকৌশল গ্র্যাজুয়েট ও দক্ষ পেশাজীবীদের জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করবে। কিন্তু প্রকল্পের ব্যয় ৪ হাজার ১৬০ কোটি টাকা থেকে বেড়ে ৭ হাজার ১১৮ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। একই সঙ্গে কমিশনিংয়ের সময়ও ২০২৪ সালের শেষ থেকে পিছিয়ে ২০২৭ সালের শেষে নেওয়া হয়েছে।

 

শাহেদ জাহিদের ভাষায়, হাজার হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগের পরও গ্রুপটি এখন অত্যন্ত অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মুখোমুখি। প্রতিটি অতিরিক্ত বিলম্ব প্রকল্পের ব্যয় বাড়াচ্ছে, আর্থিক সক্ষমতা দুর্বল করছে এবং একই সঙ্গে বিনিয়োগকারী ও ঋণদাতা—দুই পক্ষের ওপরই চাপ বাড়াচ্ছে।

 

প্রকল্পসংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিনিয়োগের পরিমাণ, কর্মসংস্থান এবং উৎপাদন সক্ষমতার বিচারে বিএমএসআইএল শুধু একটি স্টিল কারখানা নয়; এটি দেশের শিল্পায়নের বড় একটি উদ্যোগ। কিন্তু নীতিগত সিদ্ধান্ত, ব্যাংকিং জটিলতা, এলসি-সংক্রান্ত সমস্যা, বন্দর ড্যামেজ এবং ইউটিলিটি অবকাঠামোর বিলম্বের কারণে প্রকল্পটি নির্ধারিত সময়ের তুলনায় অন্তত তিন বছর পিছিয়ে গেছে।

 

এদিকে বর্তমান সরকার বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরির কথা বলছে এবং বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের উদ্যোগ নিচ্ছে। শিল্পসংশ্লিষ্টদের মতে, এখন বড় প্রয়োজন বিদ্যমান প্রকল্পগুলোর জটিলতা দূর করা, ব্যাংকিং ও এলসি ব্যবস্থাকে সহজ করা এবং বিনিয়োগকারীদের জন্য একটি স্থিতিশীল ও পূর্বানুমানযোগ্য নীতিপরিবেশ নিশ্চিত করা। কারণ একটি বড় শিল্প প্রকল্পের বিলম্ব শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের ক্ষতি নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে কর্মসংস্থান, রাজস্ব, উৎপাদন, আমদানি ব্যয় এবং সামগ্রিক অর্থনীতির সম্ভাবনা।