,

একদিনে কোটি ভ্যাক্সিন : করোনাকে রুখে দিন

আজকের কুমিল্লা ডট কম :
February 26, 2022
news-image

 

নাজমুল হুদা খান:
দেশজুড়ে আজ ১ কোটি মানুষকে করোনা ভ্যাক্সিনের প্রথম ডোজ প্রদানের গণটিকা কর্মসূচি ঘোষিত হয়েছে। চলমান কোভিড-১৯ অতিমারি নিয়ন্ত্রণকল্পে মোট জনসংখ্যার ৭০ শতাংশ জনগোষ্ঠীকে ১ম ডোজের আওতায় আনতে দেশব্যাপী অনুষ্ঠিত হচ্ছে ‘একদিনে এক কোটি কোভিড ভ্যাক্সিন প্রদান কর্মসূচি।’ এ বিশেষ কার্যক্রমের মধ্য দিয়ে দেশের সবাইকে ১ম ডোজ কোভিড-১৯ টিকা প্রদানের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। পরে দ্বিতীয় ও বুস্টার ডোজ প্রদান কার্যক্রমও জোরদার করা হবে; তবে প্রথম ডোজ প্রদান কার্যক্রমও চালু থাকবে।

প্রায় ২ বছরব্যাপী বাংলাদেশে করোনা যুদ্ধের এ আরেক মহাকর্মযজ্ঞ। করোনা রোগ তত্ত্ব, বিশ্বব্যাপী আবিষ্কৃত ও অনুমোদিত কোভিড ভ্যাক্সিনের প্রকার ও কার্যপ্রণালি এবং ভ্যাক্সিন প্রয়োগে বয়সের প্রভেদ প্রভৃতি সার্বিক বিবেচনায় প্রয় ১২ কোটি মানুষকে টিকা প্রদানের প্রাথমিক লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারিত হয়। প্রথম থেকেই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা অনুমোদিত সব উৎস থেকে ভ্যাক্সিন সংগ্রহের প্রচেষ্টা চালায় বাংলাদেশ। এ পর্যন্ত বিশ্বের অন্যতম সেরা সব ভ্যাক্সিন ফাইজার, মডার্না, অ্যাস্ট্রাজেনেকা, সিনোফার্ম, সিনোব্যাক এবং জনসন অ্যান্ড জনসন ৬টি ভ্যাক্সিন বিভিন্ন বয়স ও শ্রেণীর মানুষকে প্রদান করা হয়। এখন পর্যন্ত প্রায় সোয়া দশ কোটি মানুষকে প্রথম ডোজ, পৌনে ৮ কোটি মানুষকে ২য় ডোজ, ৩০ লাখের উপর বুস্টার ডোজ প্রদান করা হয়েছে। এছাড়া ১৫ লাখের উপর শিক্ষার্থীকে টিকার প্রথম ডোজ এবং প্রায় ৯ লাখ জনকে ২য় ডোজ প্রদান করা হয়েছে। ভাসমান জনগোষ্ঠীকেও টিকার আওতায় আনতে ইতোমধ্যে প্রায় ৩০ লাখ ছিন্নমূল মানুষকে টিকা প্রদান সম্পন্ন করেছে। শতকরা হিসেবে প্রায় ৭৫% মানুষকে ১ম ডোজ এবং পঞ্চাশ ভাগ মানুষকে ২য় ডোজ প্রদান সম্পন্ন করা হয়েছে।

ইতোমধ্যে দেশের সব টিকা প্রদান কেন্দ্রে অনিবন্ধিত সকলের ১ম ডোজ টিকা প্রদান শুরু হয়েছে। দেশব্যাপী এ টিকা প্রদান কর্মসূচিকে সফল করতে ব্যাপক পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। দেশের প্রতিটি ইউনিয়নে ৩টি টিকা দল, পৌরসভা সমূহের প্রতিটি ওয়ার্ডে ১টি টিকা দল, সিটি করপোরেশন ওয়ার্ড সমূহের প্রতিটি ওয়ার্ডে ৯টি টিকা দল গঠন ও তাদের মাধ্যমে এ টিকা কর্মসূচি সফল করার উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। উপজেলা সমূহের প্রতি ইউনিয়নে ৯০০, পৌরসভা সমূহের প্রতি ওয়ার্ডে ৩০০ এবং সিটি করপোরেশনের প্রতিটি ওয়ার্ডে ৪৫০০ জনকে টিকা প্রদানের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এজন্য ইউনিয়ন পর্যায়ে কমিউনিটি ক্লিনিক, ইউনিয়িন উপস্বাস্থ্য কেন্দ্র, ইউনিয়ন পরিষদ বা স্কুল মাঠ; পৌরসভা ও সিটি কর্পোরেশন সমূহের কমিউনিটি সেন্টার, মাতৃসদন কেন্দ্র বা সুবিধাজনক স্থানে এ টিকা প্রদান করা হবে। প্রতিটি টিকা দলে ২ জন করে ভ্যাকসিনেটর এবং ৩ জন স্বেচ্ছাসেবী থাকবেন।

নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিগনের নেতৃত্বে শিক্ষক, ধর্মীয় প্রতিনিধি, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্ধ, এনজিও প্রতিনিধি, আনসার ভিডিপি, ব্লক সুপারভাইজার, স্কাউট, গার্লস গাইড, স্থানীয় ক্লাব প্রতিনিধি, সাংবাদিক, রেড ক্রিসেন্ট স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠান, প্রভাবশালী ব্যক্তিবর্গ, ব্যবসায়ী, দোকান মালিক সমিতি প্রতিনিধি, সমাজসেবী ও দাতব্য সংস্থার প্রতিনিধি ইত্যাদি ব্যক্তিবর্গের সমন্বয়ে জনগনকে সচেতন করা এবং এ টিকা কর্মসূচিকে সফল করতে মবিলাইজিং টিম গঠনের নির্দেশ প্রদান করা হয়েছে। উপজেলা পর্যায়ে বিদ্যমান ৮টি সাব ব্লকের জন্য ৮ জন, পৌরসভায় প্রতিটি ওয়ার্ডে ৫ জন এবং সিটি কাপোরেশনে প্রতিটি টিকা দলের সঙ্গে ৫ জন সদস্য মবিলাইজেশন দলে কাজ করবেন। এ টিম সমূহ ২৬ ফেব্রুয়ারি সকাল থেকে সংশ্লিষ্ট এলাকা সমূহের বাড়ি বাড়ি গিয়ে এখনো টিকা পাননি এমন ব্যক্তির খোঁজ করবেন এবং টিকা দান কেন্দ্রে আসতে উদ্বুদ্ধ করবেন।

বাংলাদেশ সব বাধা বিপত্তি পেরিয়ে দেশের বিপুলসংখ্যক প্রয়োজনীয় সরঞ্জামাদি ও টিকা সংগ্রহ করেছে। বর্তমান দেশে প্রায় ১০ কোটি টিকা মজুদ রয়েছে। টিকা গ্রহণে প্রান্তিক ও পিছিয়ে পড়া ব্যাপক জনগোষ্ঠীকে সম্পৃক্ত করতে ভাসমান জনগোষ্ঠী, নিম্ন আয়ের জনগোষ্ঠী, পরিবহন ও কলকারখানাসহ সব স্তরের শ্রমিক, গর্ভবতী ও স্তন দানকারী নারী, স্কুল-মাদ্রাসা-বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীসহ সব বিশেষ জনগোষ্ঠীকে কোভিড-১৯ টিকার আওতায় এনেছে।

বাংলাদেশে অনুমোদিত ও ব্যবহৃত ভ্যাক্সিন সমূহের মধ্যে বিশ্বব্যাপী ব্যবহৃত ও অনুমোদিত ভাইরাল ভেক্টর ভ্যাক্সিন (কোভিশিল্ড), মেসেঞ্জার আরএনএ ভ্যাক্সিন (ফাইজার, মডার্না, জনসন অ্যান্ড জনসন) এবং নিষ্ক্রিয় ভাইরাল ভ্যাক্সিন (সিনোফার্ম ও সিনোব্যাক) প্রযুক্তির সফল ব্যবহার হচ্ছে। এ সকল ভ্যাক্সিনই শরীরের প্রতিরোধী কোষ সমূহকে উদ্দীপ্ত করে অ্যান্টিবডি সৃষ্টিতে সহায়তা করে। গবেষণায় দেখা গেছে এসব ভ্যাক্সিনের প্রতিটির ২ ডোজ, করোনা প্রতিরোধে ৮০-৯০% কার্যকর। বিশ্বব্যাপী বর্তমানে প্রচলিত ও অনুমোদিত ভ্যাক্সিন সমূহের কোনটিই করোনার সবধরনের বিরুদ্ধে শতভাগ সুরক্ষা দেয় না, তবে সব ভ্যাক্সিনই রোগের তীব্রতা, হাসপাতালমুখীতা এবং মৃত্যু হ্রাসে ভূমিকা রাখে।

বাংলাদেশের খ্যাতনামা গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও হাসপাতাল সমূহের প্রায় প্রতিটিতেই গবেষণায় দেখা গেছে করোনায় আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেছে এমন সবার প্রায় ৮০ ভাগ টিকা নেয়নি, হাসপাতাল ভর্তিদের ক্ষেত্রেও একই তথ্য-উপাত্ত পাওয়া গেছে। বাংলাদেশে করোনা সংক্রমণের ৩য় ঢেউয়ের জন্য দায়ী অমিক্রন সংক্রমণ ক্ষণস্থায়ী হয়েছে জনগণের মধ্যে ব্যাপক ভ্যাক্সিন প্রয়োগের ফলে; তা গবেষণায় উঠে এসেছে।

এছাড়া বিভিন্ন দেশের গবেষণায় দেখা গেছে যে, ষাটোর্ধ্ব বয়স্ক, কো-মর্বিডিটি রয়েছে এবং ক্রমাগত করোনা আক্রান্ত ঝুঁকিতে রয়েছে এমন ব্যক্তিদের টিকা গ্রহণে সংক্রমণ, হাসপাতাল ভর্তি এবং মৃত্যু কমিয়েছে সিংহভাগ।

উন্নত বিশ্বে দেশ যেখানে করোনা সংক্রমন ও মৃত্যুর হার প্রতিরোধে হিমশিম খাচ্ছে, সেখানে নানাবিধ সীমাবদ্ধতার মধ্যেও করোনা প্রতিরোধে বাংলাদেশের সাফল্য প্রশংসনীয়। তদুপরি এখনো আমাদের সব পর্যায়ে সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। ডেল্টা কিংবা অমিক্রন সংক্রমণকে জয় করার পথে আমরা এটি সত্য; তবে করোনা এখনো বিদায় নেয়নি। যেকোন সময় নতুন কোন ধরনের ভয়ংকর ঢেউয়ের মুখোমুখি হওয়ার মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে। তাই টিকাদান কর্মসূচিকে সফল করতে ইতিপূর্বে গণটিকা প্রদান কর্মসূচি, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর জন্মদিন উপলক্ষ্যে দেশবাসীকে ৭৫ লাখ টিকা প্রদান কর্মসূচির মতো ২৬ ফেব্রুয়ারি ‘একদিনে এক কোটি’ টিকা প্রদান কর্মসূচিকেও সফল করে করোনাকে রুখে দিতে হবে।

[লেখক : সহকারী পরিচালক,

কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতাল]