কুমিল্লা-চাঁদপুরে ১,৫৯৮ নলকূপে আর্সেনিক ঝুঁকি, উচ্চ ও গুরুতর ঝুঁকিতে ২৭.৬ শতাংশ, অ্যাপের হিসাবে ঝুঁকিপূর্ণ ৩৭৬টি নলকূপ
ইমতিয়াজ আহমেদ জিতু:
কুমিল্লা ও চাঁদপুরে ১ হাজার ৫৯৮টি নলকূপের আর্সেনিক ঝুঁকি মূল্যায়ন করে উদ্বেগজনক তথ্য প্রকাশ করেছে গবেষক দল।
স্মার্টফোনভিত্তিক প্রযুক্তি আই-আর্সেনিকের প্রাথমিক মূল্যায়নে এসব নলকূপের ২৭ দশমিক ৬ শতাংশ উচ্চ বা গুরুতর ঝুঁকির শ্রেণিতে পড়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত নলকূপগুলোর মধ্যে ৩৭৬টি এখনো ব্যবহৃত হচ্ছে।
মঙ্গলবার (১৪ অক্টোবর) কুমিল্লা প্রেস ক্লাবে এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানানো হয়।
সংবাদ সম্মেলনে বক্তারা বলেন, মূল্যায়ন করা নলকূপের মধ্যে চাঁদপুরের ১ হাজার ১৩২টি এবং কুমিল্লার ৪৬৬টি। এসব নলকূপের ৬ দশমিক ৬ শতাংশ মাঝারি এবং ৬৫ দশমিক ৮ শতাংশ নিম্ন বা বিরল ঝুঁকির শ্রেণিতে রয়েছে।
তবে গবেষকেরা বলছেন, অ্যাপের মাধ্যমে পাওয়া ফলাফল আর্সেনিকের প্রকৃত মাত্রা নিশ্চিত করে না। ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত নলকূপের পানি রাসায়নিক পরীক্ষার মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন। পরীক্ষায় নিরাপদ প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত বিকল্প নিরাপদ পানির উৎস ব্যবহার করতে হবে।
এক মিনিটেই ঝুঁকির প্রাথমিক ধারণা
আর্সেনিক পানিতে থাকলেও তা চোখে দেখা যায় না, গন্ধ বা স্বাদ দিয়েও শনাক্ত করা যায় না। ফলে দীর্ঘদিন একই নলকূপের পানি পান করেও অনেক পরিবার ঝুঁকির বিষয়ে অজ্ঞ থেকে যায়। এই পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষের কাছে আর্সেনিক ঝুঁকির তথ্য পৌঁছে দিতে কাজ করছে আই-আর্সেনিক (iArsenic) নামের একটি ডিজিটাল প্রযুক্তি।
যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব পোর্টসমাউথের নেতৃত্বাধীন গবেষক দল অস্ট্রেলিয়ার কার্টিন বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগিতায় প্রযুক্তিটি তৈরি করেছে। বাংলাদেশে মাঠপর্যায়ে এটি ব্যবহার করছে অতীশ দীপঙ্কর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (ADUST) শিক্ষার্থীরা।
নলকূপের অবস্থান, গভীরতা এবং কলতলায় জমে থাকা লাল বা কালো দাগের তথ্য ব্যবহার করে অ্যাপটি এক মিনিটের কম সময়ে সম্ভাব্য আর্সেনিক ঝুঁকির শ্রেণি নির্ধারণ করে।
গবেষক দলের দাবি, উপযুক্ত তথ্যের ভিত্তিতে এর ঝুঁকি শ্রেণিবিন্যাসের নির্ভুলতা প্রায় ৮৫ শতাংশ হতে পারে। তবে স্থান ও তথ্যের মানভেদে ফলাফলে পার্থক্য হতে পারে। এটি কোনোভাবেই সরাসরি পানি পরীক্ষার বিকল্প নয়।
৯০ মিটার বা তার বেশি গভীরতার ৫৮১টি নলকূপই অ্যাপে নিম্ন বা বিরল ঝুঁকির শ্রেণিতে পড়েছে। অন্যদিকে, ৩০ মিটারের কম গভীর নলকূপের মধ্যে চাঁদপুরে ৬০ দশমিক ৬ শতাংশ এবং কুমিল্লায় ৪৪ দশমিক ২ শতাংশ উচ্চ বা গুরুতর ঝুঁকির শ্রেণিতে রয়েছে।
অস্ট্রেলিয়ার কার্টিন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ড. আশরাফ দেওয়ান বলেন, বাংলাদেশের ভূগর্ভস্থ পানিতে আর্সেনিকের বণ্টন অত্যন্ত অসম। একই গ্রামের পাশাপাশি দুটি নলকূপেও আর্সেনিকের মাত্রা ভিন্ন হতে পারে। তাই শুধু এলাকার নাম বা নলকূপের গভীরতার ভিত্তিতে নির্ভরযোগ্যভাবে ঝুঁকি নির্ধারণ করা কঠিন।
ADUST-এর সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. জাবের আহমেদের নেতৃত্বে শিক্ষার্থীরা চাঁদপুর ও কুমিল্লার বিভিন্ন এলাকায় বাড়ি বাড়ি গিয়ে নলকূপের ঝুঁকি মূল্যায়ন করছেন। স্কুল, মসজিদ, মাদ্রাসা ও স্থানীয় সামাজিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমেও তাঁরা বাসিন্দাদের অ্যাপটি ব্যবহারের পদ্ধতি শেখাচ্ছেন।
ড. জাবের আহমেদ বলেন, অনেক মানুষ আর্সেনিকের সমস্যা সম্পর্কে জানলেও নিজের নলকূপের পানির ঝুঁকি সম্পর্কে নিশ্চিত নন। শিক্ষার্থীরা সরাসরি মানুষের কাছে প্রযুক্তিটি পৌঁছে দিচ্ছেন। মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা থেকে অ্যাপটিকে আরও সহজ ও ব্যবহারবান্ধব করার প্রয়োজনীয়তাও বোঝা যাচ্ছে।
প্রাথমিক জাতীয় জরিপের তথ্য অনুযায়ী, ২০০০ সালের দিকে প্রায় সাড়ে তিন কোটি মানুষ জাতীয় মানদণ্ডের চেয়ে বেশি আর্সেনিকযুক্ত পানি পান করতেন। ২০০৯ সালে এ সংখ্যা কমে প্রায় ২ কোটি ২০ লাখে দাঁড়ায়। তবে পরবর্তী সময়ে অগ্রগতির গতি ধীর হয়ে আসে।
জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের (DPHE) উদ্যোগে ২০২১ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে প্রায় ৬৫ লাখ নলকূপের পানি পরীক্ষা করা হয়।
ADUST-এর বোর্ড অব ট্রাস্টিজের চেয়ারম্যান শামসুল আলম বলেন, আর্সেনিক নিরসনে অতীতে বিপুল অর্থ ও সম্পদ ব্যয় হলেও সবার জন্য নিরাপদ পানি নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। কার্যকর পরিকল্পনা, জবাবদিহি এবং জনগণের অংশগ্রহণের মাধ্যমে নিরাপদ পানির ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
তিনি আরও বলেন, সরকারি প্রতিষ্ঠান, বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষক, উন্নয়ন সহযোগী ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। আই-আর্সেনিকের মতো প্রযুক্তি কোথায় পানি পরীক্ষা এবং নিরাপদ পানির অবকাঠামো স্থাপন বেশি জরুরি, তা চিহ্নিত করতে সহায়তা করতে পারে।
সরকারি ই-সেবায় আই-আর্সেনিক
গবেষক দলের তথ্য অনুযায়ী, আই-আর্সেনিক ইতিমধ্যে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের ওয়েবসাইটে ই-সেবা হিসেবে তালিকাভুক্ত হয়েছে। এর মাধ্যমে সাধারণ মানুষের কাছে নলকূপের সম্ভাব্য ঝুঁকির তথ্য পৌঁছে দেওয়ার নতুন সুযোগ তৈরি হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আর্সেনিক মোকাবিলায় শুধু নতুন নলকূপ স্থাপন যথেষ্ট নয়। পরীক্ষায় নিরাপদ প্রমাণিত বিদ্যমান নলকূপের পানি ব্যবহারে উৎসাহ দেওয়া, নিয়মিত পানি পরীক্ষা এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বিকল্প নিরাপদ পানির ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। গবেষণালব্ধ তথ্যকে স্থানীয় পরিকল্পনা ও সরকারি বিনিয়োগের সঙ্গে যুক্ত করা গেলে আর্সেনিকের সংস্পর্শ কমানোর উদ্যোগ আরও কার্যকর হতে পারে।
সাংবাদিক সম্মেলনে ভার্চুয়াল ও অফলাইনে বক্তব্য রাখেন এডাস্ট বোর্ড অফ ট্রাস্টিজের চেয়ারম্যান শামসুল আলম লিটন, সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের সহযোগি অধ্যাপক ড. জাবের আহমদ, ইংল্যান্ডের ইউনিভার্সিটি অফ পোর্টসমাউথের সিনিয়র লেকচারার ড. মোঃ হক।
এ সময় আরো উপস্থিত ছিলেন, শিক্ষার্থী নিবির খান, মোঃ ইমন পাঠান, মৃদুল হাসান তন্ময়, সোলায়মান খান নয়ন, প্রসেনজিৎ নন্দী, মংচিং ওয়াং মারমা, আরমান হোসেন, সামিউল ইসলাম, ওমর ফারুক, আলমাস প্লাবন ও শাহরিয়ার প্রমূখ।