বিদায়ের মঞ্চে মেসি: রোসারিও থেকে বিশ্বজয়, কান্না থেকে গৌরব , আকাশি-সাদায় ২১ বছরের মহাকাব্য
ইমতিয়াজ আহমেদ জিতু:
একটি রাত। একটি স্টেডিয়াম। ৮৫ হাজারের বেশি মানুষ। হাতে আর্জেন্টিনার পতাকা, গায়ে ১০ নম্বর জার্সি। কারও হাতে মেসির মুখের মুখোশ, কারও হাতে এৎধপরধং খবড় লেখা পোস্টার। কারও চোখে পানি, কারও মুখে হাসি। আর সবার কণ্ঠে একই শব্দ
‘মেসি… মেসি… মেসি…’
বুয়েনস আয়ার্সের এস্তাদিও মনুমেন্তাল মঙ্গলবার রাতে যেন শুধু একটি ফুটবল মাঠ ছিল না। সেটি হয়ে উঠেছিল একটি যুগের বিদায়মঞ্চ। ২১ বছর ধরে আর্জেন্টিনার আকাশি-সাদা জার্সি গায়ে যিনি কোটি কোটি মানুষের আবেগের নাম হয়ে ছিলেন, সেই লিওনেল আন্দ্রেস মেসি শেষবারের মতো জাতীয় দলের হয়ে মাঠে নামলেন। প্রতিপক্ষ বেনিন। ম্যাচটি ছিল প্রীতি ম্যাচ। কিন্তু সেদিন ম্যাচের গুরুত্ব ছিল না ফলাফলে; গুরুত্ব ছিল একজন মানুষের বিদায়ে।
মেসি এসেছিলেন খেলতে, বিদায় নিতে নয় ,শেষবারের মতো ফুটবল খেলতে। আর শেষবারেও তিনি মেসিই রয়ে গেলেন।
আর্জেন্টিনা ৩-০ গোলে হারাল বেনিনকে। নিকোলাস ওতামেন্দির গোলের পেছনে মেসির অবদান, নিকো পাজের গোলের আক্রমণেও তার জাদুকরি উপস্থিতি, আর ৭১ মিনিটে পেনাল্টি থেকে নিজেই করলেন গোল। ৩৯ বছর বয়সী এই কিংবদন্তির আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের শেষ ম্যাচে গোলসংখ্যা পৌঁছাল ১২৬-এ। রেকর্ড ২০৮তম আন্তর্জাতিক ম্যাচ দিয়ে শেষ হলো তার আর্জেন্টিনা অধ্যায়। কিন্তু স্কোরলাইন সেদিন আসলে গল্পের সবচেয়ে ছোট অংশ।
বড় গল্পটি হলো একটি ছোট্ট ছেলের স্বপ্ন কীভাবে একটি দেশের স্বপ্ন হয়ে উঠেছিল। তারপর সেই স্বপ্ন ভেঙেছে। আবার জোড়া লেগেছে। আবার ভেঙেছে। আবার ফিরে এসেছে। আর শেষ পর্যন্ত বিশ্বকাপ হাতে নিয়ে সেই ছেলে দাঁড়িয়েছে পৃথিবীর সবচেয়ে উঁচু ফুটবল মঞ্চে।
বিদায়ের আগেই কাঁদছিলেন মেসি:
ম্যাচের আগে আর্জেন্টিনা দলের বাস যখন মনুমেন্তালের দিকে যাচ্ছিল, বাইরে হাজারো মানুষ অপেক্ষা করছিল। বাসের জানালার পাশে বসে ছিলেন মেসি। রাস্তার দুই পাশে পতাকা।
আকাশি-সাদা জার্সি পরা মানুষ। হাতে ব্যানার। মুখে মেসির নাম। এই দৃশ্য দেখে চোখের পানি আটকে রাখতে পারেননি তিনি। ২১ বছর আগের সেই তরুণ মেসি থেকে আজকের ৩৯ বছরের মেসি হয়তো এক মুহূর্তে তার চোখের সামনে ফিরে এসেছিল সবকিছু। প্রথম জাতীয় দল। প্রথম লাল কার্ড। প্রথম বিশ্বকাপ। প্রথম ফাইনাল। প্রথম বড় ব্যর্থতা। সমালোচনা। অবসর। প্রত্যাবর্তন। কোপা আমেরিকা। বিশ্বকাপ। আবার কোপা আমেরিকা। তারপর ২০২৬ বিশ্বকাপের ফাইনাল। আর এখন শেষ ম্যাচ।
স্টেডিয়ামে পৌঁছে তিনি স্ত্রী আন্তোনেলা রোকুজ্জো এবং সন্তানদের উপস্থিতি নিশ্চিত করেন। মাঠে প্রবেশের সময় তিন সন্তানকে সঙ্গে নিয়েছিলেন। গ্যালারিতে ছিলেন স্ত্রী ও মা সেলিয়া কুচ্চিত্তিনি।
ম্যাচ শুরুর আগে মাঠের মাঝখানে বিছিয়ে দেওয়া হয় বিশাল আর্জেন্টাইন জার্সি। ১০ নম্বরের ওপর লেখা “এৎধপরধং ’’ ধন্যবাদ। তারপর জাতীয় সংগীত। মেসির চোখে আবার পানি। এবারও তিনি নিজেকে সামলাতে পারেননি।
এ যেন শুধু জাতীয় সংগীত নয়; নিজের জীবনের একটি অধ্যায়ের শেষ গান শুনছিলেন তিনি।

‘দ্য লাস্ট ট্যাঙ্গো’:
আর্জেন্টাইন ফুটবলে মেসির বিদায়ী ম্যাচের নাম হয়ে উঠেছিল ‘দ্য লাস্ট ট্যাঙ্গো’। ট্যাঙ্গো আর্জেন্টিনার সংস্কৃতির অংশ। আর মেসির ফুটবলও যেন এক ধরনের ট্যাঙ্গো দুই পায়ে নয়, মূলত বাঁ পায়ে; কিন্তু প্রতিটি স্পর্শে ছন্দ, গতি, বিরতি, প্রতারণা ও সৌন্দর্য। বেনিনের বিপক্ষে ম্যাচে সেই শেষ ট্যাঙ্গোও ছিল মেসির মতোই।
প্রথমার্ধে গোল হয়নি। মেসিও শুরুতে খুব একটা ছন্দে ছিলেন না। কিন্তু প্রতিপক্ষের খেলোয়াড়েরা বারবার তার কাছে এসে আলিঙ্গন করছিলেন। সম্মান জানাচ্ছিলেন। ১০ মিনিটের কাছাকাছি সময়ে মেসির ১০ নম্বর জার্সির প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে ম্যাচ থামিয়ে গ্যালারি দাঁড়িয়ে অভিবাদন জানায় তাকে। তারপর যেন মেসি বুঝলেন অনুষ্ঠান শেষ, এবার ফুটবল। দ্বিতীয়ার্ধে তিনি আবার সেই পরিচিত মেসি। ওতামেন্দির গোলে অবদান। তারপর নিকো পাজের গোলের আক্রমণে জাদুকরি ভূমিকা। আর ৭১ মিনিটে পেনাল্টি। বলটি হাতে নিলেন মেসি।
এই দৃশ্য তিনি জীবনে অসংখ্যবার দেখেছেন। কিন্তু এবার পার্থক্য একটাই। এরপর আর কোনোদিন আর্জেন্টিনার জার্সিতে এই দৃশ্য দেখা যাবে না। মেসি গোল করলেন। তার ১২৬তম আন্তর্জাতিক গোল। শেষ ম্যাচেও গোল। শেষ ম্যাচেও জয়। শেষ ম্যাচেও মেসি। শেষ বাঁশির পর ম্যাচ শেষ হওয়ার পর স্টেডিয়ামের আলো যেন আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠল। মেসিকে ঘিরে সতীর্থরা।
গ্যালারিতে পতাকা। আকাশে ড্রোন শো। আতশবাজি। মেসির মুখের ছবি। তার ১০ নম্বর। এৎধপরধং। আর তারপর মাইক্রোফোন হাতে সেই মানুষটি, যার কথা শুনতে পুরো স্টেডিয়াম নিস্তব্ধ। মেসি কথা বললেন। কণ্ঠে কান্না। চোখে পানি। কিন্তু মুখে প্রশান্তি। তিনি বললেন, আর্জেন্টিনার জার্সি পরে ২০ বছরের বেশি সময় খেলতে পারা তার জন্য ছিল অসীম গর্বের বিষয়। সবচেয়ে কঠিন সময়েও তিনি লড়াই থামাননি। তিনি বললেন, আর ফিরে না আসা তার জন্য গভীরভাবে কষ্টের। এমনকি তিনি সারাজীবন আর্জেন্টিনার হয়ে খেলতে চাইতেন।
তার ভাষায়, জাতীয় দলের হয়ে খেলা তার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর অনুভূতিগুলোর একটি। এটাই হয়তো মেসির জাতীয় দলের গল্পের সবচেয়ে সুন্দর জায়গা। যে মানুষটিকে একসময় বলা হয়েছিল দেশের জন্য যথেষ্ট আবেগী নন, বিদায়ের সময় সেই মানুষই বললেন- আর্জেন্টিনার জার্সিই ছিল তার স্বপ্ন, গর্ব ও জীবন। বিদায়ের আগে দেওয়া ভিডিও বার্তাতেও তিনি বলেছিলেন-তিনি শান্ত মনে বিদায় নিচ্ছেন, কারণ তিনি সবকিছু দিয়ে চেষ্টা করেছেন। আর্জেন্টিনার জার্সি ছিল তার স্বপ্ন, গর্ব ও জীবন।

বাবাকে মনে পড়ল:
বিদায়ী বক্তব্যে মেসি স্মরণ করেন তার প্রয়াত বাবা হোর্হে মেসিকে। কয়েক মাস আগেই বাবাকে হারিয়েছেন তিনি। ফুটবল জীবনের সবচেয়ে বড় সাফল্যগুলোর প্রায় প্রতিটি মুহূর্তেই হোর্হে ছিলেন তার পাশে। রোসারিওর সেই ছোট্ট ছেলেটির ফুটবল প্রতিভা যখন ধীরে ধীরে প্রকাশ পাচ্ছিল, তখন বাবাই ছিলেন তার সবচেয়ে বড় সমর্থকদের একজন। মেসির জীবনে বাবা শুধু বাবা ছিলেন না। ছিলেন পথপ্রদর্শক। ম্যানেজার। আস্থার জায়গা। ফুটবলের প্রথম দিকের কঠিন সিদ্ধান্তগুলোর অন্যতম মানুষ। তাই বিদায়ের মুহূর্তে তার কথা মনে পড়া অস্বাভাবিক নয়। মেসির জন্য জাতীয় দলের শেষ ম্যাচটি ছিল একই সঙ্গে আনন্দ, গর্ব, কষ্ট এবং শূন্যতার রাত।
গল্পের শুরু রোসারিওতে:
আজকের মেসিকে বুঝতে হলে ফিরতে হবে ১৯৮৭ সালের রোসারিওতে।২৪ জুন জন্ম লিওনেল আন্দ্রেস মেসির। একটি সাধারণ আর্জেন্টাইন পরিবারে জন্ম নেওয়া এই শিশুটি ছোটবেলা থেকেই ফুটবলের প্রতি অস্বাভাবিক রকমের আকৃষ্ট ছিলেন। তার পরিবারের ফুটবল-সংযোগ ছিল। বাবা হোর্হে মেসি স্থানীয় একটি কারখানায় কাজ করতেন এবং স্থানীয় ফুটবল দলের সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। মেসির বড় ভাইয়েরাও ফুটবল খেলতেন। বাড়িতে ফুটবল ছিল প্রায় প্রতিদিনের বিষয়। কিন্তু ছোট লিওর মধ্যে যা দেখা যাচ্ছিল, তা ছিল অন্যরকম। সে বল পায়ে নিলে তাকে থামানো কঠিন। ছোট বয়সেই তার ড্রিবলিং, ভারসাম্য, গতি ও বল নিয়ন্ত্রণ অন্যদের চেয়ে আলাদা হয়ে ওঠে। মাত্র কয়েক বছর বয়সেই তিনি স্থানীয় ক্লাব গ্রান্দোলির হয়ে খেলতে শুরু করেন।
তারপর নিউয়েলস ওল্ড বয়েজ। সেখানে মেসি ছিলেন এক বিস্ময়। কিন্তু ফুটবলের পথে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াল তার শারীরিক বৃদ্ধি। মেসির গ্রোথ হরমোনের ঘাটতি ছিল। চিকিৎসার প্রয়োজন ছিল নিয়মিত। খরচও কম ছিল না। পরিবারের পক্ষে দীর্ঘমেয়াদে সেই ব্যয় বহন করা কঠিন হয়ে উঠছিল। এমন সময় সামনে আসে ইউরোপের দরজা। বার্সেলোনা।

১৩ বছরের ছেলের আটলান্টিক পাড়ি:
১৩ বছর বয়সে মেসি চলে গেলেন স্পেনে।বার্সেলোনার বিখ্যাত যুব একাডেমি—লা মাসিয়ায়।একটি শিশু।পরিবার থেকে দূরে। ভিন্ন দেশ। ভিন্ন ভাষা। ভিন্ন সংস্কৃতি। কিন্তু একটি জিনিস একই, ফুটবল। লা মাসিয়ায় মেসির প্রতিভা দ্রুত প্রকাশ পেতে থাকে। ছোটখাটো শরীর, কিন্তু বল পায়ে অসাধারণ ভারসাম্য। প্রতিপক্ষের শরীরের ফাঁক দিয়ে বল নিয়ে বেরিয়ে যাওয়া। একাধিক খেলোয়াড়কে কাটিয়ে যাওয়া। গোল করা। গোল করানো। কোচদের নজর কাড়তে বেশি সময় লাগেনি। তারপর বয়সভিত্তিক দল পেরিয়ে মূল দলে ওঠার পালা। ২০০৪ সালের ১৬ অক্টোবর বার্সেলোনার মূল দলের হয়ে প্রতিযোগিতামূলক অভিষেক। তখন তার বয়স মাত্র ১৭। সেদিন কেউ জানত না, এই ছেলেটিই একদিন বার্সেলোনার ইতিহাসের সবচেয়ে বড় নাম হয়ে উঠবেন।
বার্সেলোনায় মেসির রাজত্ব:
বার্সেলোনার হয়ে মেসির ক্যারিয়ার ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম দীর্ঘ ও সফল অধ্যায়।২০০৪ থেকে ২০২১।প্রায় ১৭ বছর।এই সময়ে তিনি ক্লাবটির হয়ে ৭০০-এর বেশি গোল করেছেন।জিতেছেন লা লিগা।কোপা দেল রে।চ্যাম্পিয়নস লিগ।ক্লাব বিশ্বকাপ।সুপার কাপ।অসংখ্য ব্যক্তিগত পুরস্কার।ব্যালন ডি’অর।বার্সেলোনার হয়ে মেসি শুধু গোল করতেন না।তিনি ছিলেন পুরো আক্রমণের কেন্দ্র।তার পায়ে বল মানেই সম্ভাবনা।দূর থেকে শট।বক্সের মধ্যে ঢুকে গোল। ডিফেন্ডারদের মাঝখান দিয়ে দৌড়।ফ্রি-কিক।পাস।অ্যাসিস্ট।এবং এমন সব গোল, যা পরদিনও বিশ্বাস করতে কষ্ট হতো।২০১২ সালে এক ক্যালেন্ডার বছরে ৯১ গোল করার ঘটনা তাকে ফুটবল ইতিহাসে অন্য এক স্তরে নিয়ে যায়।তারপর একে একে রেকর্ড ভাঙতে থাকলেন তিনি।বার্সেলোনার জার্সিতে ৭৭৮ ম্যাচে ৬৭২ গোল—ক্লাবটির ইতিহাসে এই সংখ্যাগুলো শুধু রেকর্ড নয়; একটি যুগের পরিচয়।
কিন্তু আর্জেন্টিনা? বার্সেলোনায় মেসি সবকিছু জিতছিলেন। কিন্তু জাতীয় দলের জার্সিতে যেন গল্পটি অন্যরকম।২০০৫ সালে আর্জেন্টিনার হয়ে অভিষেক।হাঙ্গেরির বিপক্ষে।মাঠে নামলেন।কিন্তু কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই লাল কার্ড। আন্তর্জাতিক ফুটবলের প্রথম ম্যাচেই এমন অভিজ্ঞতা। তবে সেটি ছিল কেবল শুরু। পরের দুই দশকে তিনি হয়ে উঠলেন আর্জেন্টিনার সবচেয়ে বড় তারকা।

২০০৬ বিশ্বকাপ স্বপ্নের প্রথম দরজা:
জার্মানি বিশ্বকাপ।তখন মেসি তরুণ।দলের মূল তারকা নন।তবুও তার প্রতিভা নিয়ে তখন থেকেই বিশ্ব ফুটবলে আলোচনা।বিশ্বকাপে অভিষেক।অভিষেকেই গোল।কিন্তু সেই বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা কোয়ার্টার ফাইনালে জার্মানির কাছে টাইব্রেকারে হেরে যায়।মেসির বিশ্বকাপ স্বপ্নের প্রথম অধ্যায় শেষ।কিন্তু সামনে ছিল আরও অনেক কিছু।
২০১৪ বিশ্বকাপের সবচেয়ে কাছে: ব্রাজিল বিশ্বকাপ। এবার মেসি দলের অধিনায়ক ও প্রধান তারকা। গ্রুপ পর্বে দুর্দান্ত। এক ম্যাচের পর আরেক ম্যাচে গোল।আর্জেন্টিনা উঠে গেল ফাইনালে।প্রতিপক্ষ জার্মানি।মারাকানা।একটি ম্যাচ।একটি স্বপ্ন।৯০ মিনিটে গোল নেই।অতিরিক্ত সময়।তারপর মারিও গোটজে।জার্মানির গোল।আর্জেন্টিনা হারল।মেসি দাঁড়িয়ে রইলেন।বিশ্বকাপ ট্রফি কয়েক মিটার দূরে।কিন্তু তার হাতে উঠল না।তবুও তিনি পেলেন গোল্ডেন বল।সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কার।কিন্তু ব্যক্তিগত পুরস্কার তখন তার কাছে সান্ত্বনা ছিল না। তার প্রয়োজন ছিল একটি ট্রফি।
২০১৫ আরেকটি ফাইনাল, আরেকটি ব্যর্থতা:
কোপা আমেরিকা। আর্জেন্টিনা ফাইনালে। প্রতিপক্ষ চিলি। ৯০ মিনিটে গোল নেই। অতিরিক্ত সময়েও নেই। টাইব্রেকার। আর্জেন্টিনা হারল। মেসির অপেক্ষা আরও দীর্ঘ হলো।

২০১৬ যে রাতে মেসি অবসর নিয়েছিলেন:
এক বছর পর আবার কোপা আমেরিকা।সেন্টেনারিও সংস্করণ।আর্জেন্টিনা আবার ফাইনালে। প্রতিপক্ষ চিলি।আবার টাইব্রেকার। মেসি পেনাল্টি মিস করলেন।আর্জেন্টিনা আবার হারল।এবার তিনি ভেঙে পড়লেন।এতগুলো ফাইনাল।এতগুলো ব্যর্থতা।জাতীয় দলের হয়ে সবকিছু দেওয়ার পরও ট্রফি নেই। তারপর এল সেই ঘোষণা। মেসি আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসর নিচ্ছেন।সারা বিশ্ব স্তব্ধ।২৯ বছরের একজন খেলোয়াড়।যার সামনে আরও অনেক বছর।
কিন্তু মেসি তখন মানসিকভাবে ক্লান্ত।দেশের হয়ে ব্যর্থতার দায় যেন সবসময় তার ঘাড়ে। অনেকেই বলছিলেন-বার্সেলোনায় সফল, কিন্তু আর্জেন্টিনায় ব্যর্থ। মেসিও হয়তো সেই চাপ থেকে বেরিয়ে যেতে চেয়েছিলেন। কিন্তু আর্জেন্টিনা মেসিকে ছাড়েনি। মেসি অবসর ঘোষণা করলেন। কিন্তু আর্জেন্টাইনরা তাকে ছাড়ল না।রাস্তায় মানুষ।স্টেডিয়ামে মানুষ।সামাজিক মাধ্যমে মানুষ।সাবেক খেলোয়াড়েরা।সতীর্থরা।সবাই বলল-ফিরে আসুন। আপনাকে আমাদের প্রয়োজন।মেসি ফিরে এলেন। মাত্র কয়েক সপ্তাহের ব্যবধানে। আর সেই প্রত্যাবর্তন বদলে দিল তার গল্পের পরবর্তী অধ্যায়।
২০২১ অবশেষে প্রথম বড় ট্রফি:
ব্রাজিল।মারাকানা।কোপা আমেরিকার ফাইনাল।আর্জেন্টিনা বনাম ব্রাজিল।ম্যাচের একমাত্র গোল অ্যাঞ্জেল দি মারিয়ার।আর্জেন্টিনা জিতল।২৮ বছর পর বড় আন্তর্জাতিক শিরোপা।মেসির জন্যও প্রথম বড় সিনিয়র আন্তর্জাতিক শিরোপা।ম্যাচ শেষে মেসি মাঠে বসে পড়লেন। চোখে পানি।সতীর্থরা তাকে ঘিরে ধরলেন।এটি শুধু একটি ট্রফি ছিল না।এটি ছিল তার সমালোচকদের জবাব।এটি ছিল বছরের পর বছর অপেক্ষার অবসান।এটি ছিল সেই অবসরের পর ফিরে আসার সবচেয়ে সুন্দর পুরস্কার।
২০২২ ফাইনালিসিমা থেকে বিশ্বকাপ:
২০২২ সালে আর্জেন্টিনা ইউরোপীয় চ্যাম্পিয়ন ইতালিকে হারিয়ে ফাইনালিসিমা জিতল।তারপর কাতার।বিশ্বকাপ।প্রথম ম্যাচেই সৌদি আরবের কাছে হার।পুরো আর্জেন্টিনা আতঙ্কিত।বিশ্বকাপ কি আবার শেষ?না।মেসির দল ফিরে এল।মেক্সিকোর বিপক্ষে গোল।অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে গোল।নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে নাটকীয় জয়।ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে জয়।তারপর ফাইনাল। মেসি বনাম ফ্রান্স, একটি মহাকাব্য। লুসাইল স্টেডিয়াম।আর্জেন্টিনা বনাম ফ্রান্স।মেসির শেষ বিশ্বকাপ হওয়ার সম্ভাবনা।প্রথমার্ধে আর্জেন্টিনা ২-০।মেসি পেনাল্টি থেকে গোল করলেন।দ্বিতীয়ার্ধে ফ্রান্স ফিরে এল।কিলিয়ান এমবাপ্পে দুই গোল। ২-২। অতিরিক্ত সময়।
মেসি আবার গোল করলেন। ৩-২।কিন্তু এমবাপ্পে আবার গোল করলেন।৩-৩।টাইব্রেকার।আর্জেন্টিনা জিতল।মেসি বিশ্বকাপ জিতলেন। সেই ছবি-মেসি হাতে বিশ্বকাপ। মাথায় কালো বিশত পরানো।চারপাশে সতীর্থরা।কখনও ট্রফির দিকে তাকাচ্ছেন।কখনও আকাশের দিকে।কখনও চোখ বন্ধ করছেন।সেই মুহূর্তটি ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম বিখ্যাত দৃশ্য হয়ে গেল।যে খেলোয়াড়কে বছরের পর বছর বলা হয়েছিল‘তোমার বিশ্বকাপ নেই।’সেই মেসিই এখন বিশ্বচ্যাম্পিয়ন।বিশ্বকাপে সাত গোল।তিন অ্যাসিস্ট।গোল্ডেন বল। এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ট্রফি।২০১৪ সালের কান্না বদলে গেল ২০২২ সালের আনন্দে।
বিশ্বকাপের পরও থামেননি:
বিশ্বকাপ জয়ের পর অনেকে ভেবেছিলেন, এবার মেসি জাতীয় দল ছেড়ে দেবেন।কিন্তু তিনি থেকে গেলেন। ২০২৪ সালে আবার কোপা আমেরিকা।ফাইনালে কলম্বিয়া।ম্যাচ কঠিন।মেসি চোটে মাঠ ছাড়লেন।বেঞ্চে বসে কাঁদলেন।কিন্তু আর্জেন্টিনা জিতল। পরপর বড় আন্তর্জাতিক শিরোপা। ২০২১ কোপা। ২০২২ ফাইনালিসিমা ও বিশ্বকাপ। ২০২৪ কোপা। মেসির আর্জেন্টিনা তখন আর আগের সেই ব্যর্থ দল নয়। এটি হয়ে উঠেছে একটি বিজয়ী প্রজন্ম।

২০২৬ শেষ বিশ্বকাপ:
বয়স ৩৯।অনেকেই ভাবছিলেন, মেসি কি সত্যিই বিশ্বকাপ খেলবেন?তিনি খেললেন। এবং শুধু খেললেন না আবারও দলকে ফাইনালে নিয়ে গেলেন।আর্জেন্টিনা এবারও অসাধারণ পথ পাড়ি দিল।ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সেমিফাইনাল ছিল কঠিন।আর্জেন্টিনা জিতল ২-১।মেসি ও সতীর্থদের শারীরিক-মানসিক চাপ ছিল প্রচণ্ড।তারপর ফাইনাল।প্রতিপক্ষ স্পেন।আর্জেন্টিনা হারল ১-০ গোলে। যদিও ফাইনাল ম্যাচটি ঘিওে বেশ বির্তকের জন্ম দিয়েছে। ১৯৯০, ২০১৪ এর পর আরেকটি বির্তকিত ফাইনাল ছিল এটি। ফাইনালের আগে খেলোয়াড়দের মনোবল খারাপ ছিল, দুই রক্ষণের দেয়াল কুটি রোমেরো ও লিসান্দ্রো ইনজুরি নিয়ে মাঠ থেকে উঠে গেল। এনজোকে বির্তকিত লাল কার্ড দেখানো হল। স্পেন ২১টি ফাইল করেও কোন কার্ড দেখেনি।
ডি বক্সেও বাইওে মেসিকে দুইবার ফাউল করলো, কোন ফ্রি-কিক পেলো না আর্জেন্টিনা। মার্টিনেজ মাঠে নামলেন না। মেসি আবার ফাইনালের পর কাঁদলেন। কিন্তু এবার দৃশ্যটি ২০১৪ সালের মতো ছিল না। কারণ এবার তার হাতে আগে থেকেই বিশ্বকাপ আছে। তিনি নিজের জীবনের সবচেয়ে বড় স্বপ্ন পূরণ করেছেন। ২০২৬ বিশ্বকাপে মেসি আট গোল ও চার অ্যাসিস্ট করে আর্জেন্টিনাকে ফাইনালে তুলেছিলেন। গোল্ডেন বলের প্রাপ্য হয়েও মেসিকে সেরা প্লেয়ার ঘোষণা হয়নি। এটা ছিল আরেকটা বির্তক। ফাইনালের পর তিনি লিখেছিলেন, হারার কষ্ট ছিল প্রচণ্ড, কিন্তু দলের অর্জন ও সমর্থকদের ভালোবাসা নিয়ে তিনি গর্বিত।
এবার সত্যিই সময় হলো:
৩৯ বছর বয়সে আরেকটি বিশ্বকাপ? অসম্ভব নয়। কিন্তু বাস্তবতা হলো শরীর আর আগের মতো নেই।বিশ্বকাপের প্রতিটি ম্যাচের শারীরিক চাপ।ইংল্যান্ডের সঙ্গে সেমিফাইনালের ধকল।ফাইনালের মানসিক চাপ।তারপর নিজের জীবনেও বাবার মৃত্যু। সবকিছু মিলিয়ে মেসি বুঝলেন- সময় এসেছে। ৩১ আগস্ট ২০২৬ তিনি ঘোষণা করলেন, আর্জেন্টিনা জাতীয় দল থেকে অবসর নিচ্ছেন। ফিফা তার সিদ্ধান্তের কথা জানিয়ে উল্লেখ করে, মেসি বলেছিলেন সিদ্ধান্তটি তাকে কষ্ট দিয়েছে, কিন্তু তিনি বুঝেছেন সময় এসেছে। তিনি আরও বলেন, শুধু সাম্প্রতিক সাফল্যের সময় নয়, আগের কঠিন সময়েও তিনি জার্সির জন্য সবকিছু দিয়েছেন।

কেন শুধু বেনিনের বিপক্ষেই শেষ ম্যাচ?
২০২৬ সালের আন্তর্জাতিক সূচিতে আর্জেন্টিনার আরও ম্যাচ ছিল।কিন্তু মেসি সবগুলো খেলেননি।তিনি চেয়েছিলেন, শেষবার নিজের দেশের মানুষের সামনে মাঠে দাঁড়িয়ে বিদায় নিতে।সেই কারণেই বেছে নেওয়া হলো বেনিন ম্যাচ।স্থান-মনুমেন্তাল।বুয়েনস আয়ার্স। আর্জেন্টিনার সবচেয়ে ঐতিহাসিক ফুটবল মঞ্চগুলোর একটি।এখানেই বিশ্বকাপ জয়ের পর দেশে ফিরে আর্জেন্টিনা প্রথম ম্যাচ খেলেছিল।এখানেই আবার মেসির শেষ ম্যাচ।বৃত্তটা যেন সম্পূর্ণ হলো।
বিদায়ের অনুষ্ঠানও ছিল মেসির মতো:
আর্জেন্টিনা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন বিদায়ের জন্য মিনিট ধরে অনুষ্ঠান সাজিয়েছিল। সংগীত। আলো। ড্রোন। আতশবাজি। গান। শিল্পীদের পরিবেশনা। ম্যাচের আগে, বিরতিতে এবং ম্যাচ শেষে ছিল আলাদা আয়োজন। অনুষ্ঠানের শেষ লাইনে লেখা ছিল শুধু ঝড়ৎঢ়ৎবংধ চমক। মেসির বিদায়েও যেন শেষ পর্যন্ত একটি রহস্য রেখে দিতে চেয়েছিল আর্জেন্টিনা।
সম্মানসূচক ডক্টরেট:
বিদায়ী ম্যাচের আগে আরও একটি বিরল সম্মান পান মেসি।বুয়েনস আয়ার্স বিশ্ববিদ্যালয় তাকে সম্মানসূচক ডক্টরেট প্রদান করে। ফুটবলের বাইরেও তার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রভাবকে স্বীকৃতি দেওয়ার প্রতীক হয়ে ওঠে এই সম্মান। মেসি নিজেও রসিকতা করে বলেন ‘আমি সম্মানসূচক ডাক্তার!’ একজন ফুটবলারের জীবনে এমন সম্মান নিঃসন্দেহে ব্যতিক্রমী।

রিভার প্লেটের বিশেষ সম্মান:
মেসির বিদায়ের সঙ্গে আরেকটি প্রতীকী ঘটনা জড়িয়ে যায়। রিভার প্লেট তাকে সম্মানসূচক সদস্যপদ দেয়। বিশেষ কার্ডে ছিল একটি সংখ্যা- অজএ ১৮১২২০২২ অর্থাৎ ১৮ ডিসেম্বর ২০২২। যেদিন আর্জেন্টিনা বিশ্বকাপ জিতেছিল। রিভার প্লেটের পক্ষ থেকে মেসির হাতে স্মারক ও বিশেষ জার্সিও তুলে দেওয়া হয়। এ যেন একটি ছোট্ট কার্ডে মেসির জাতীয় দলের গল্পের সবচেয়ে বড় দিনটিকে আটকে রাখা।
১০ নম্বর মিনিটে থেমে গেল ম্যাচ:
মেসির ১০ নম্বর।আর্জেন্টিনার ১০ নম্বর।মারাদোনার ১০ নম্বর।এবার সেই ১০ নম্বরকে সম্মান জানাতে ম্যাচের ১০ মিনিটে খেলা থামানো হলো।৮৫ হাজারের বেশি দর্শক দাঁড়িয়ে গেলেন।হাততালি।স্লোগান।আবেগ।মেসি তাকিয়ে রইলেন।হাত নাড়লেন। সম্ভবত নিজের মধ্যেই বললেন-‘এটাই শেষ।’
সতীর্থদের ভালোবাসা:
মেসির বিদায়ে সতীর্থদের বক্তব্যও ছিল আবেগপূর্ণ।রদ্রিগো দে পল বলেছেন, মেসি তাকে শুধু ফুটবলার হিসেবে নয়, মানুষ হিসেবেও বড় হতে সাহায্য করেছেন।তিনি মেসিকে ভাইয়ের সঙ্গে তুলনা করেছেন। অ্যাঞ্জেল দি মারিয়া বলেছেন, এটি এমন একটি দিন, যেটি কেউ চায়নি আসুক।
আর নেইমার? মেসির দীর্ঘদিনের বন্ধু ও সতীর্থ নেইমার সামাজিক মাধ্যমে লিখেছেন—শুধু আর্জেন্টিনা নয়, পুরো বিশ্ব মেসির কাছে কৃতজ্ঞ।ফুটবলকে আরও ভালোবাসতে শেখানোর জন্যও তাকে ধন্যবাদ জানান নেইমার। এই শ্রদ্ধাগুলো প্রমাণ করে-মেসির প্রভাব শুধু পরিসংখ্যানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।
একটি দেশের সঙ্গে সম্পর্কের গল্প:
মেসির সঙ্গে আর্জেন্টিনার সম্পর্ক ছিল অদ্ভুত। শুরুতে সন্দেহ।তারপর প্রত্যাশা।তারপর সমালোচনা।তারপর হতাশা।তারপর অবসর।তারপর প্রত্যাবর্তন।তারপর ভালোবাসা।শেষ পর্যন্ত শ্রদ্ধা।আজ যে মানুষকে বিদায় দিতে ৮৫ হাজার মানুষ স্টেডিয়ামে এসেছে, সেই মানুষটিকেই একসময় দেশের ব্যর্থতার প্রতীক বানানো হয়েছিল।এই পরিবর্তনটাই মেসির গল্পের সবচেয়ে বড় অংশ।

‘মেসি বার্সেলোনার, আর্জেন্টিনার নয়’ অভিযোগের দিনগুলো:
বার্সেলোনায় তিনি সব জিতছিলেন।আর্জেন্টিনায় ফাইনাল হারছিলেন। সমালোচকেরা বলতেন-‘বার্সেলোনায় মেসি, আর্জেন্টিনায় অন্য মেসি।’কেউ বলতেন, তার মধ্যে দিয়েগো মারাদোনার মতো জাতীয় দলের আবেগ নেই।কেউ বলতেন, তিনি আর্জেন্টিনার জন্য যথেষ্ট লড়েন না।কিন্তু সময় সব উত্তর দিয়েছে।মেসি অবসর নিয়েছিলেন।আবার ফিরেছেন।কোপা জিতেছেন।বিশ্বকাপ জিতেছেন। আবার কোপা জিতেছেন।আবার বিশ্বকাপ ফাইনালে উঠেছেন।শেষ ম্যাচে গোল করেছেন।তারপর বলেছেন-আমি সবকিছু দিয়ে চেষ্টা করেছি।এরপর আর আসলে বলার মতো কিছু থাকে না।
ক্লাব ফুটবলে নতুন অধ্যায় পিএসজি:
বার্সেলোনার সঙ্গে বিচ্ছেদ মেসির ক্যারিয়ারের সবচেয়ে আবেগপূর্ণ অধ্যায়গুলোর একটি।২০২১ সালে আর্থিক সংকট ও চুক্তিগত বাস্তবতার কারণে বার্সেলোনা ছাড়তে হয় তাকে।তিনি যোগ দেন প্যারিস সেন্ট জার্মেইতে।প্যারিসে সময়টা বার্সেলোনার মতো নিখুঁত ছিল না।তবুও তিনি ফরাসি লিগ জেতেন।তারপর আসে জীবনের নতুন অধ্যায়।
ইন্টার মায়ামি আমেরিকায় মেসির দ্বিতীয় জীবন:
২০২৩ সালে মেসি যোগ দেন ইন্টার মায়ামিতে।যুক্তরাষ্ট্রের ফুটবলে তার আগমন যেন পুরো লিগের চেহারা বদলে দেয়।স্টেডিয়াম পূর্ণ।টিকিটের চাহিদা বাড়ে।বিশ্বের বড় বড় দর্শক মেজর লিগ সকার দেখতে শুরু করেন।মেসি সেখানে লিগস কাপ জেতেন।পরে সাপোর্টার্স শিল্ডসহ আরও সাফল্য আসে।২০২৬ সালেও তিনি ইন্টার মায়ামির হয়ে খেলছেন।অর্থাৎ জাতীয় দলের অধ্যায় শেষ হলেও মেসির পেশাদার ফুটবল অধ্যায় এখনো পুরোপুরি শেষ হয়নি।
মেসির রেকর্ড:
তার আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের শেষ হিসাব:
ম্যাচ: ২০৮
গোল: ১২৬
অ্যাসিস্ট: ৭০-এর কাছাকাছি/রেকর্ড পর্যায়ের। তিনি আর্জেন্টিনার সর্বোচ্চ ম্যাচ খেলা ফুটবলার। সর্বোচ্চ গোলদাতা।
জাতীয় দলের হয়ে সবচেয়ে বেশি বড় টুর্নামেন্টে অংশ নেওয়া খেলোয়াড়দের একজন। এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপজয়ী অধিনায়ক।
শুধু পরিসংখ্যান দিয়ে মেসিকে বোঝা যাবে না , মেসির নামের পাশে অসংখ্য সংখ্যা।গোল।অ্যাসিস্ট।ম্যাচ।ট্রফি।ব্যালন ডি’অর। কিন্তু একজন খেলোয়াড়ের উত্তরাধিকার কি শুধু সংখ্যায় মাপা যায়? মেসির ক্ষেত্রে যায় না। কারণ মেসি এমন এক সময়ের ফুটবলার, যাকে মানুষ শুধু খেলতে দেখেনি অনুভব করেছে।তার ড্রিবলিং দেখে শিশুরা ফুটবল শুরু করেছে।তার গোল দেখে বাবা ছেলের সঙ্গে রাত জেগেছে।তার হার দেখে মানুষ কেঁদেছে।তার বিশ্বকাপ জয়ে রাস্তায় নেমেছে।তার বিদায়ে আবার কেঁদেছে। এই আবেগই একজন কিংবদন্তিকে সাধারণ সেরা খেলোয়াড় থেকে আলাদা করে।

মেসির সবচেয়ে বড় জয়:
অনেকে বলবেন-বিশ্বকাপ তার সবচেয়ে বড় জয়।কেউ বলবেন-ব্যালন ডি’অর।কেউ বলবেন-বার্সেলোনার ছয়-সাত-আটটি শিরোপার যুগ।কেউ বলবেন-১২৬ আন্তর্জাতিক গোল।কিন্তু মেসির সবচেয়ে বড় জয় হয়তো অন্য জায়গায়।তিনি হাল ছাড়েননি।২০১৪ সালের পর হাল ছাড়েননি।২০১৫ সালের পর হাল ছাড়েননি।২০১৬ সালের পর অবসর নিয়েও আবার ফিরেছেন।২০২২ সালের আগে বারবার বিশ্বকাপের ব্যর্থতা সত্ত্বেও চেষ্টা করেছেন।আর ২০২৬ সালে বিশ্বকাপ ফাইনালে হারের পরও মাথা নিচু করে পালিয়ে যাননি। তিনি শেষ ম্যাচ খেলেছেন।গোল করেছেন।মানুষকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন। তারপর বলেছেন-আমি শান্তিতে বিদায় নিচ্ছি।
শেষ দৃশ্যটি কেমন ছিল?:
ম্যাচ শেষ।মেসি মাঝমাঠে।সতীর্থরা চারপাশে।গ্যালারি দাঁড়িয়ে।আকাশে আলো।ড্রোনে মেসির ছবি।আতশবাজি।তারপর মেসির হাতে মাইক্রোফোন।কিছুক্ষণ কথা বললেন।কণ্ঠ ভারী হয়ে এলো।চোখে পানি।তিনি বললেন, আর্জেন্টিনার জার্সি পরা ছিল তার জন্য বিশাল গর্বের।বললেন, আর না আসাটা গভীরভাবে কষ্ট দেবে।বললেন, সারাজীবন খেলতে চাইতেন।কিন্তু তিনি জানেন-এখন সময় নতুনদের জন্য।তিনি এখন থেকে গ্যালারিতে বসে আর্জেন্টিনার ছেলেদের সমর্থন করবেন।এটি ছিল বিদায় নয় শুধু।এটি ছিল দায়িত্ব হস্তান্তর।
মেসির পর আর্জেন্টিনা:
মেসির পর কী? আর্জেন্টিনার ১০ নম্বর কে পরবেন? কে হবে দলের নতুন নেতা?কে নেবে সেই সৃজনশীল দায়িত্ব? নিকো পাজ? ফ্রাঙ্কো মাস্তান্তুোনো? নাকি অন্য কেউ? মেসির মতো আরেকজন মেসি আসবে না। আসার প্রয়োজনও নেই। কারণ ইতিহাসে কিছু খেলোয়াড় একবারই আসে। মারাদোনা একবার। পেলে একবার। মেসি একবার। নতুন প্রজন্মকে এখন নিজেদের গল্প লিখতে হবে।
শেষ পর্যন্ত মেসি কী রেখে গেলেন?
একটি বিশ্বকাপ।দুটি কোপা আমেরিকা।একটি ফাইনালিসিমা।একটি অলিম্পিক সোনা।একটি যুব বিশ্বকাপ।অসংখ্য রেকর্ড।অসংখ্য গোল।অসংখ্য স্মৃতি।কিন্তু সবচেয়ে বড় করে রেখে গেলেন-একটি শিক্ষা।প্রতিভা আপনাকে শুরুতে এগিয়ে দিতে পারে।কিন্তু শেষ পর্যন্ত টিকে থাকতে লাগে পরিশ্রম।ব্যর্থতার পর ফিরে আসতে লাগে সাহস।সমালোচনার পর দাঁড়িয়ে থাকতে লাগে মানসিক শক্তি।আর স্বপ্ন পূরণ করতে লাগে অপেক্ষা করার ক্ষমতা।মেসি এই চারটিই দেখিয়েছেন।
২১ বছর পর শেষ হলো একটি অধ্যায়:
২০০৫ সালে জাতীয় দলের অভিষেক।তারপর ২১ বছর।২০৮ ম্যাচ।১২৬ গোল।বিশ্বকাপ।কোপা আমেরিকা।অসংখ্য জয়।অসংখ্য হার।অসংখ্য কান্না।শেষে আবার হাসি।আর ২০২৬ সালের ৬ অক্টোবর-আর্জেন্টিনার জার্সিতে শেষ ম্যাচ।বেনিনের বিপক্ষে ৩-০ জয়।মেসির গোল।মেসির অ্যাসিস্ট।মেসির চোখে পানি।গ্যালারিতে কান্না।তারপর বিদায়।
‘মেসি বিদায় নিলেন, মেসি থেকে গেলেন’ :
হয়তো এটাই সবচেয়ে সত্য কথা।জাতীয় দলের জার্সি থেকে মেসি বিদায় নিয়েছেন।কিন্তু আর্জেন্টিনার ফুটবল ইতিহাস থেকে তিনি কখনো বিদায় নেবেন না।রোসারিওর কোনো ছোট্ট ছেলে যখন প্রথমবার বল পায়ে নেবে, তার বাবা হয়তো বলবেন-‘দেখো, মেসির মতো খেলো।’কোনো শিশু যখন ড্রিবল করতে গিয়ে পড়ে যাবে, আবার উঠে দাঁড়াবে, তখন হয়তো তার ঘরের দেয়ালে মেসির ছবি থাকবে।কোনো তরুণ যখন আর্জেন্টিনার ১০ নম্বর জার্সি পরবে, তখন তার ওপর থাকবে এক অসম্ভব বড় উত্তরাধিকার।কারণ সেই জার্সির সঙ্গে এখন মিশে গেছে মেসির নাম।

শেষ কথা: ফুটবলের মাঠে শেষ নয়:
লিওনেল মেসির জাতীয় দলের গল্প শেষ।কিন্তু মেসির গল্প শেষ নয়।তিনি এখনও ক্লাব ফুটবলে আছেন।এখনও বল পায়ে মাঠে নামবেন।এখনও গোল করবেন।হয়তো আরেকটি রেকর্ড করবেন।হয়তো কোনো ম্যাচে আবার জাদুকরি ফ্রি-কিক নেবেন।হয়তো কোনো তরুণ সতীর্থকে গোল করাবেন।কিন্তু আর্জেন্টিনার আকাশি-সাদা জার্সিতে আর সেই দৃশ্য দেখা যাবে না।আর তাই বুয়েনস আয়ার্সের সেই রাতটি শুধু একটি বিদায়ী ম্যাচ ছিল না।এটি ছিল একটি প্রজন্মের বিদায়। একজন ফুটবলারের নয়, একটি যুগের বিদায়।একটি ছেলে রোসারিও থেকে বেরিয়েছিল।শরীরের সমস্যার সঙ্গে লড়েছিল।
১৩ বছর বয়সে দেশ ছেড়েছিল। বার্সেলোনায় গিয়ে পৃথিবীর সেরা ফুটবলারদের একজন হয়েছিল।জাতীয় দলে এসে প্রথমে লাল কার্ড দেখেছিল।বিশ্বকাপ ফাইনাল হেরেছিল।কোপা আমেরিকার ফাইনাল হেরেছিল।২০১৬ সালে জাতীয় দল ছেড়ে দিয়েছিল।আবার ফিরে এসেছিল। ২০২১ সালে প্রথম বড় আন্তর্জাতিক ট্রফি জিতেছিল।২০২২ সালে বিশ্বকাপ জিতেছিল।২০২৪ সালে আবার কোপা জিতেছিল।২০২৬ সালে শেষবার বিশ্বকাপ ফাইনালে উঠেছিল।সেখানে হারল।তারপরও মাথা উঁচু রাখল।আর শেষবার আর্জেন্টিনার জার্সি গায়ে মাঠে নেমে গোল করল।জিতল।কাঁদল।ধন্যবাদ জানাল। বিদায় নিল। এই তো মেসি।
তিনি হয়তো আর আর্জেন্টিনার হয়ে খেলবেন না। কিন্তু আর্জেন্টিনা ফুটবলের ইতিহাসে তার অধ্যায়ের পাশে কোনো ‘শেষ’ শব্দ বসানো যাবে না।কারণ কিছু গল্প শেষ হয় না।তারা শুধু কিংবদন্তিতে পরিণত হয়। লিওনেল মেসি আর্জেন্টিনার ১০ নম্বর, বিশ্বচ্যাম্পিয়ন অধিনায়ক, এবং একটি প্রজন্মের সবচেয়ে প্রিয় ফুটবল-স্বপ্ন। বিদায়, লিও। ধন্যবাদ।