আর কত অপমান করবেন জান্নাতুল তাজমিন ও তার পরিবারকে? এবার থামুন!
মোঃ রাসেল:
কুমিল্লা ফরিদা বিদ্যায়তনের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী জান্নাতুল তাজমিন আর এই পৃথিবীতে নেই। একটি নিষ্পাপ প্রাণের করুণ পরিণতি আমাদের বিবেককে নাড়া দেওয়ার কথা। অথচ দুঃখজনকভাবে, কিছু মানুষের কাছে এই মর্মান্তিক ঘটনাটিও যেন ভিউ, লাইক আর আয়ের উপলক্ষ হয়ে উঠেছে!
তার ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে কাটাছেঁড়া, কোথায় গিয়েছিল, কার সঙ্গে ছিল, কেন একা বের হয়েছিল, মা-বাবা কেন খোঁজ রাখেননি- এমন নানা প্রশ্ন তুলে মৃত শিশুটিকে এবং তার পরিবারকে আর কতটা অপমান করবেন আপনারা?
ধরে নিলাম, মেয়েটির কিছু ভুল ছিল। সে হয়তো মা-বাবার কথা শুনত না, হয়তো তার আচরণ নিয়ে পরিবারের দুশ্চিন্তা ছিল। তাই বলে কি তার বেঁচে থাকার অধিকার ছিল না? তাই বলে কি তাকে ধর্ষণ করে হত্যা করার অধিকার কারও জন্মায়?
কোনো মানুষের ভুল কখনোই ধর্ষণ বা হত্যার বৈধতা হতে পারে না।
সে ভালো ছিল, নাকি খারাপ—সেই বিচার করার আগে আমাদের প্রশ্ন করা উচিত, একটি শিশু কতটা নিরাপদ এই সমাজে? কেন বারবার নারী ও শিশু নির্যাতন, ধর্ষণ ও হত্যার মতো ঘটনা ঘটছে? কোথায় আমাদের নিরাপত্তাব্যবস্থা? অপরাধীদের দ্রুত বিচারের আওতায় আনতে আমরা কতটা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছি?
আমি জান্নাতুল কিংবা তার মা-বাবার পক্ষ নিয়ে সাফাই গাইছি না। আমি শুধু বলতে চাই, একটি সন্তানের বেড়ে ওঠায় ভুল থাকতে পারে, কিন্তু সেই ভুলের দায়ে তাকে অপমান করা কিংবা তার প্রতি সংঘটিত অপরাধকে আড়াল করা যায় না।
যে পরিবার একটি সন্তানকে হারিয়েছে, তারা এমনিতেই অসহনীয় শোকের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। সন্তান মানুষ করতে গিয়ে সব মা-বাবা সব সময় সফল হন না। কোনো সন্তান ভুল পথে গেলে তাকে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা, পারিবারিক সংকট কিংবা তাদের ব্যর্থতা থাকতে পারে। কিন্তু আজ সন্তানটি আর নেই। এই শোকের মুহূর্তে তার পরিবারের ক্ষতকে আরও গভীর করে দেওয়ার মধ্যে মানবিকতা কোথায়?
সাংবাদিক ভাই ও বোনেরা, আপনাদের কাছে অনুরোধ—সংবাদ করুন, অবশ্যই করুন। কিন্তু সংবাদ হোক অপরাধীর পরিচয় উন্মোচনে, বিচার নিশ্চিত করার দাবিতে, নারী ও শিশুদের নিরাপত্তা নিয়ে। সংবাদ হোক এমন একটি সমাজ গড়ার জন্য, যেখানে কোনো শিশু নির্যাতনের শিকার হওয়ার ভয়ে থাকবে না, কোনো পরিবার সন্তান হারানোর আতঙ্কে দিন কাটাবে না।
একটি মৃত শিশুর ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে চর্চা করে নয়, তার সঙ্গে ঘটে যাওয়া অপরাধের বিচার নিশ্চিত করার মধ্য দিয়েই প্রকৃত দায়িত্ব পালন করা সম্ভব।
টাকা সবারই প্রয়োজন, জনপ্রিয়তাও অনেকের কাম্য। কিন্তু সেই চাহিদা পূরণ করতে গিয়ে কারও শোক, কারও অসহায়ত্ব আর একটি মৃত শিশুর সম্মানকে পুঁজি করা কি সত্যিই সাংবাদিকতা?
মনে রাখবেন, আজ যে পরিবারটি শোকের সাগরে ডুবে আছে, কাল এমন পরিস্থিতি যে কারও পরিবারে আসতে পারে।
তাই আসুন, মৃত শিশুটির চরিত্র নিয়ে নয়, অপরাধীর অপরাধ নিয়ে কথা বলি। তার পরিবারের অতীত খুঁড়ে নয়, ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার দাবি তুলে ধরি।
জান্নাতুল তাজমিনের জন্য ন্যায়বিচার চাই। তার পরিবারের প্রতি মানবিক হই। আর দয়া করে, ভিউয়ের প্রতিযোগিতায় একটি শোকাহত পরিবারকে আর অপমান করবেন না।
এবার থামুন। শোকাহত পরিবারটিকে শান্তিতে শোক করার সুযোগ দিন।
লেখক:
মোঃ রাসেল