কুমিল্লায় লিফটের নিচে রংমিস্ত্রির রক্তাক্ত মরদেহ, ৪৮ ঘন্টায়ও মামলা হয়নি,তিন লাখ টাকায় সমঝোতার চেষ্টা!
স্টাফ রিপোর্টার:
কুমিল্লা নগরীর হাউজিং এস্টেটের একটি ভবনের ক্যাপসুল লিফটের নিচ থেকে মো. কিরণ মিয়া (৪০) নামে এক রংমিস্ত্রির রক্তাক্ত মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। তাঁর কপাল ও পায়ে আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। কীভাবে তিনি লিফটের নিচে গেলেন,এ নিয়ে তৈরি হয়েছে রহস্য। হত্যাকাণ্ডের পর প্রায় দুই দিন অতিবাহিত হতে যাচ্ছে, এখনো থানায় মামলা হয়নি।
বিভিন্ন সূত্রমতে, নিহতের পরিবার গরিব হওয়ায় একটি প্রভাবশালী মহল তিন লাখ টাকায় এই ঘটনাটিকে ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করছে। নিহতের পরিবারের দাবি, তাদের মামলা নেওয়া হচ্ছে না।
সোমবার (২৮ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যার পর কুমিল্লা হাউজিং এস্টেটের ১ নম্বর সেকশনের ‘জনতা ব্যাংক’ নামে পরিচিত একটি ভবন থেকে তাঁর মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
নিহত কিরণ মিয়া নগরীর দ্বিতীয় মুরাদপুর এলাকার বাসিন্দা সুন্দর আলীর ছেলে।
পুলিশ ও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে,সোমবার সকালে ওই ভবনে রংয়ের কাজ করতে যান কিরণ মিয়া। বেলা ১১টার দিকে নাশতা করার কথা বলে তিনি ভবন থেকে বের হন। এরপর আর বাড়িতে ফেরেননি। পরিবারের সদস্যরা বিভিন্ন স্থানে খোঁজাখুঁজি শুরু করেন।
সন্ধ্যার দিকে কুমিল্লা সদর উপজেলা পরিষদের সামনে, কেটিসিসির বিপরীতে অবস্থিত ওই ভবনেও কিরণকে খোঁজা শুরু হয়। একপর্যায়ে ভবনের লিফট পরীক্ষা করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। পরে লিফটের মেকানিক রেটজিটেক লিমিটেডের কর্মী রাজু ঘটনাস্থলে গিয়ে লিফট খুললে নিচে কিরণ মিয়ার রক্তাক্ত মরদেহ পড়ে থাকতে দেখা যায়।
ঘটনার পর ভবনের দারোয়ান সেখান থেকে চলে গেছেন বলে স্থানীয় কয়েকজন জানিয়েছেন। তবে কেন তিনি চলে গেছেন, সে বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
ঘটনাটি ঘিরে নিহতের পরিবার ও স্বজনদের পক্ষ থেকে আরও একটি অভিযোগ সামনে এসেছে। তাঁদের ভাষ্য, ভবনের মালিকের ছেলে সায়েমের কাছে পাওনা বেতনের টাকা চাইতে গিয়েছিলেন কিরণ মিয়া। এ সময় তাঁকে থাপ্পড় মারা হয় বলে অভিযোগ তাঁদের।
তবে এই অভিযোগের একাধিকবার মুঠোফোনে এ বিষয়ে সায়েমের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
ভবনের এক বাসিন্দার অভিযোগ,ঘটনার পর ভবনের সিসিটিভি ক্যামেরা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই বাসিন্দা বলেন, ঘটনার সময় বা তার আগে সিসিটিভি চালু ছিল কি না এবং কখন ক্যামেরা বন্ধ হয়েছে,তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
তবে ক্যামেরা কেন বন্ধ ছিল, কখন বন্ধ করা হয়েছে কিংবা এর সঙ্গে কিরণ মিয়ার মৃত্যুর কোনো সম্পর্ক রয়েছে কি না,এ মুহূর্তে তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
স্থানীয় সূত্রে আরও জানা গেছে, ভবনের মালিকের ছেলে শুভ অস্ট্রেলিয়া যাওয়ার উদ্দেশ্যে ঘটনার পর তাঁর ভাই সায়েমকে সঙ্গে নিয়ে ঢাকার বিমানবন্দরের দিকে রওনা হন। তবে তাঁদের সঙ্গে কিরণ মিয়ার মৃত্যুর কোনো সম্পর্ক রয়েছে—এমন কোনো সিদ্ধান্ত পুলিশ এখনো জানায়নি।
রেটজিটেক লিমিটেডের কর্মী রাজু বলেন, সন্ধ্যা সাড়ে সাতটার পর তিনি ঘটনাস্থলে যান। তখন ভবনের লোকজন কিরণ মিয়াকে খুঁজছিলেন। লিফটের ভেতরে কেউ আটকা পড়েছেন কি না, সেটিও দেখা হচ্ছিল। পরে লিফট খুলে নিচে মরদেহ পাওয়া যায়।
স্থানীয় বাসিন্দা মকবুল বলেন, লিফটটি জেনারেটরের মাধ্যমে চলছিল। একপর্যায়ে সেটি বন্ধ হয়ে যায়। তাঁর প্রশ্ন, লিফট কীভাবে বন্ধ হলো এবং কিরণ মিয়া কীভাবে লিফটের নিচে গেলেন—তা তদন্ত করে বের করা প্রয়োজন।
তিনি আরও বলেন, নিহত ব্যক্তি দরিদ্র পরিবারের হওয়ায় অর্থের বিনিময়ে ঘটনাটি ধামাচাপা দেওয়া হচ্ছে কি না, সেটিও তদন্ত করে দেখা দরকার।
ভবনের মালিক খোরশেদ আলম বলেন, আমরা সারাদিন খুঁজেও তাঁকে পাইনি। পরে ধারণা করি, তিনি হয়তো এখানে থাকতে পারেন। এরপর লিফটের নিচে খোঁজ করে তাঁর মরদেহ পাওয়া যায়।”
ঘটনাস্থলে থাকা কোতোয়ালি মডেল থানার এএসআই শরীফ আহমেদ বলেন, “বাড়ির মালিক ৯৯৯ নম্বরে ফোন করার পর পুলিশ ঘটনাস্থলে যায়। তখন সেখানে অনেক লোকজন জড়ো হয়েছিলেন। আমরা বিষয়টি নিয়ে কাজ করছি।”
কুমিল্লা কোতোয়ালি মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) তৌহিদুল আনোয়ার বলেন, “নিহতের কপাল ও পায়ে আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। তবে এটা হত্যাকাণ্ড না। হয়তো লিফট থেকে পড়ে ব্যথা পেয়ে মারা গেছে। নিহতের পরিবার অপমৃত্যু মামলা করলে মামলা নিব।