,

কুমিল্লার দুর্গাপুরে ওয়ারিশ সনদে পিতৃপরিচয় বদলের অভিযোগ, টার্গেট সেকান্দর আলীর সম্পত্তি

আজকের কুমিল্লা ডট কম :
September 27, 2026
news-image

নিজস্ব প্রতিবেদক:

কুমিল্লার আদর্শ সদর উপজেলার দুর্গাপুরে মৃত এক ব্যক্তির সম্পত্তি নিয়ে বিরোধে একের পর এক নথি সামনে আসছে। পুরোনো ওয়ারিশ সনদে যে ব্যক্তিদের নাম নেই, পরবর্তী সময়ে তাঁদেরই ওয়ারিশ হিসেবে দেখিয়ে নতুন সনদ দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। শুধু তা-ই নয়, অভিযুক্ত জাহাঙ্গীর আলমের পিতার নাম ও জন্মতারিখ নিয়েও বিভিন্ন সময়ের ভোটার তালিকা, কাবিননামা ও অন্যান্য নথিতে অসঙ্গতি থাকার দাবি করেছেন সম্পত্তির দাবিদার নূরুল আমিন ভূঁইয়া।

অভিযোগকারীর দাবি, এর আগে একই দাবির ভিত্তিতে সেকান্দর আলী ভূঁইয়ার সম্পত্তির একটি অংশের নামজারি করে ১৫৮১ নম্বর খারিজি খতিয়ান সৃষ্টি করা হয়েছিল। পরে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব), কুমিল্লার আদালতে করা নামজারি আপিলের পর ওই খারিজি খতিয়ান বাতিল হয়। সেই প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের পরও ২০২৬ সালে একই ব্যক্তিকে সেকান্দর আলী ভূঁইয়ার ছেলে দেখিয়ে নতুন ওয়ারিশ সনদ দেওয়ায় এখন প্রশ্ন উঠেছে—পুরোনো সিদ্ধান্ত ও নথি যাচাই না করেই কি নতুন সনদ দেওয়া হয়েছে?

ঘটনার প্রতিকার চেয়ে কুমিল্লা আদর্শ সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কাছে লিখিত আবেদন করেছেন সেকান্দর আলী ভূঁইয়ার ছেলে মো. নূরুল আমিন ভূঁইয়া। তাঁর অভিযোগ, সম্পত্তির মালিকানা দাবি করার উদ্দেশ্যে জাহাঙ্গীর আলমকে সেকান্দর আলী ভূঁইয়ার ছেলে এবং জমিলা খাতুনকে তাঁর স্ত্রী হিসেবে দেখিয়ে নতুন ওয়ারিশ সনদ নেওয়া হয়েছে।

নূরুল আমিন ভূঁইয়া বলেন, তাঁর বাবা মরহুম হাজী সেকান্দর আলী ভূঁইয়া ১৯৯৩ সালের ২০ সেপ্টেম্বর মারা যান। মৃত্যুকালে তাঁর স্ত্রী রাহেলা খাতুন, দুই ছেলে হাজী আব্দুল বারী ভূঁইয়া ও নূরুল আমিন ভূঁইয়া এবং চার মেয়ে ছিলেন। সেকান্দর আলী ভূঁইয়ার জীবদ্দশায় বা মৃত্যুর পর কোনো পর্যায়েই জমিলা খাতুন নামে কোন দ্বিতীয় কোন স্ত্রী ছিলেন না এবং দ্বিতীয় স্ত্রী হিসেবে পরিবারের ওয়ারিশ তালিকায় অন্তর্ভুক্ত ছিলো না।

নূরুল আমিনের দাবি, দুর্গাপুর ইউনিয়ন পরিষদের বিভিন্ন সময়ের চেয়ারম্যানের কাছ থেকে সেকান্দর আলী ভূঁইয়ার প্রকৃত ওয়ারিশদের নামে একাধিক ওয়ারিশ সনদ দেওয়া হয়। ১৯৯৮ সালের ১৪ মার্চ, ২০১১ সালের ২১ জুন এবং ২০১৭ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারির সনদগুলোর কোথাও জমিলা খাতুনকে সেকান্দর আলী ভূঁইয়ার স্ত্রী কিংবা জাহাঙ্গীর আলমকে তাঁর ছেলে হিসেবে উল্লেখ করা হয়নি।

এরপর ২০২২ সালের ২৩ জানুয়ারিও একই ইউনিয়ন পরিষদ থেকে সেকান্দর আলী ভূঁইয়ার ওয়ারিশদের নামে আরেকটি সনদ দেওয়া হয়। ওই সনদের নম্বর ২০২২১৯১৬৭৯৪০০০৮০৪। সেখানেও নূরুল আমিনসহ আগের ওয়ারিশদের নাম রয়েছে।

কিন্তু ২০২৬ সালের ১৭ মে দেওয়া নতুন ওয়ারিশ সনদে দৃশ্যপট বদলে যায়। ২৪১৯১৬৭৯৪১৭০০৪৩৯৮ নম্বরের ওই সনদে জমিলা খাতুনকে সেকান্দর আলী ভূঁইয়ার স্ত্রী এবং জাহাঙ্গীর আলমকে তাঁর ছেলে হিসেবে দেখানো হয়েছে বলে আবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

নূরুল আমিনের অভিযোগ, জাহাঙ্গীর আলম ও জমিলা খাতুনকে সেকান্দর আলী ভূঁইয়ার স্ত্রী ও ছেলে দেখিয়ে এর আগেও একটি ভূয়া ওয়ারিশ সনদ নেওয়া হয়েছিল। ওই সনদের ভিত্তিতে সেকান্দর আলী ভূঁইয়ার সম্পত্তির একটি অংশের জন্য ১৫৮১ নম্বর খারিজি খতিয়ান সৃষ্টি করা হয়।

এর বিরুদ্ধে নূরুল আমিন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব), কুমিল্লার আদালতে ২৯৮/১৬-১৭ নম্বর নামজারি আপিল মামলা করেন। তাঁর আবেদনে বলা হয়েছে, সংশ্লিষ্ট নথি ও কাগজপত্র পর্যালোচনার পর ২০১৮ সালের ১ জুলাই অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) আদেশ দেন এবং ১৫৮১ নম্বর খারিজি খতিয়ান বাতিল করা হয়।

নূরুল আমিনের দাবি, ওই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে জমিলা খাতুন ও জাহাঙ্গীর আলমের সেকান্দর আলী ভূঁইয়ার স্ত্রী ও ছেলে হিসেবে দাবি করার বিষয়টি প্রশাসনিকভাবে গ্রহণযোগ্যতা পায়নি।

তবে ২০২৬ সালে আবারও একই পরিচয়ে ওয়ারিশ সনদ দেওয়ায় আগের প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের সঙ্গে নতুন সনদের সামঞ্জস্য নিয়েই এখন বড় প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

ভোটার তালিকায় বদলে গেছে পিতার নাম?

অনুসন্ধানের দাবি তুলে নূরুল আমিন আরও কিছু নথির কথা উল্লেখ করেছেন। তাঁর দাবি, ১৯৯৫ সালের ভোটার তালিকায় জাহাঙ্গীর আলমের পিতার নাম হাজী সেকান্দর আলী ভূঁইয়া লেখেন, পরবর্ত্তীতে তা আইনগত ভিত্তি না পাওয়ায় ২০০০সালের ভোটার তালিকায় (ভোটার নং ২০০) জাহাঙ্গীর আলমের পিতার নাম ‘একরাম আলী’ হিসেবে লিখেন। পরবর্তী সময়ে আবারো প্রতারনার জন্য সর্বশেষ স্মার্ট ভোটার আইডি কার্ডে তাঁর পিতার নাম হাজী সেকান্দর আলী ভূঁইয়া হিসেবে উল্লেখ করেছেন। কিন্তু তার মা জমিলা খাতুনের আইডিতে তার স্বামী একরামুল হক রয়েছে।

নূরুল আমিন বলেন, ১৯৯৫ সালের ভোটার তালিকায় জাহাঙ্গীর আলমের বয়স ২৩ বছর দেখানো হয়েছিল। অন্যদিকে পরবর্তী সময়ের ভোটার তালিকায় তাঁর জন্মতারিখ হিসেবে ১ জানুয়ারি ১৯৭১ উল্লেখ করা হয়। এসব তথ্যের মধ্যে অসঙ্গতি রয়েছে বলে দাবি তাঁর।

তিনি আরও বলেন, ১৯৭৫ সালের ভোটার তালিকায় জমিলা খাতুনের আরেক ছেলে মো. সেলিমের জন্মতারিখ ১ ফেব্রুয়ারি ১৯৭৫ এবং জাহাঙ্গীর আলমের জন্মতারিখ অন্য একটি নথিতে ১ জানুয়ারি ১৯৭৫ হিসেবে দেখানো হয়েছে। একই মায়ের ক্ষেত্রে জন্মতারিখের এমন ব্যবধান নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি।

তবে এসব তথ্যের সত্যতা এবং বিভিন্ন নথিতে একই ব্যক্তির জন্মতারিখ বা পিতার নাম পরিবর্তনের কারণের বিষয়টি তদন্তের দাবি জানিয়েছেন অভিযোগকারী।

নূরুল আমিন আরও দাবি করেন, জমিলা খাতুন অতীতে সেকান্দর আলী ভূঁইয়াকে স্বামী দাবি করে তাঁর বিরুদ্ধে মামলা করেছিলেন। তদন্ত শেষে ওই মামলায় ফাইনাল রিপোর্ট দেওয়া হয়। পরবর্তী সময়ে মামলাটি খারিজ হয়।

জাহাঙ্গীর আলমের পরিচয় নিয়ে প্রশ্ন তুলতে নূরুল আমিন ১৯৮৮ সালের ১ নভেম্বরের একটি কাবিননামার তথ্যও সামনে এনেছেন। তাঁর দাবি, ওই কাবিননামায় জাহাঙ্গীর আলমের বয়স ২৪ বছর উল্লেখ রয়েছে।

নূরুল আমিনের বক্তব্য, কাবিননামায় উল্লেখিত বয়সের সঙ্গে পরবর্তী ভোটার তালিকা ও অন্যান্য নথিতে থাকা জন্মতারিখের হিসাব মিলিয়ে দেখলে অসঙ্গতি পাওয়া যায়।

তিনি বলেন, ‘একই ব্যক্তির পিতার নাম, জন্মতারিখ ও বয়স বিভিন্ন নথিতে ভিন্ন হলে বিষয়টি সাধারণ ভুল হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। কোন নথিটি সঠিক, কোনটি পরে তৈরি বা সংশোধিত হয়েছে—প্রশাসনের উচিত তা তদন্ত করে বের করা।’

অন্যদিকে, অভিযোগের বিষয়ে জাহাঙ্গীর আলম এর সাথে একাধিকবার মুটোফোনসহ বিভিন্নভাবে যোগাযোগ করার চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি।
অভিযোগের বিষয়ে ২ নম্বর দুর্গাপুর ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান সোনিয়া আক্তার বলেন, ‘আগের মামলার বিষয়ে আমার জানা ছিল না। জাহাঙ্গীর আলম আমাকে জাতীয় পরিচয়পত্র ও পাসপোর্টের কপি দেখিয়েছেন। সেগুলো অনুযায়ী আমি ওয়ারিশ সনদ দিয়েছি।’

তিনি আরও বলেন, ‘এ বিষয়ে কোনো অভিযোগ থাকলে বিষয়টি তদন্ত করা হবে। তদন্তে ভুয়া প্রমাণিত হলে সনদটি বাতিল করা হবে।

এ বিষয়ে কুমিল্লা আদর্শ সদর উপজেলার ইউএনও এর দায়িত্বপ্রাপ্ত সহকারী কমিশনার ভূমি মসাশিয়াত আক্তার বলেন, ‘দুর্গাপুরে ভুয়া ওয়ারিশ সনদের অভিযোগ পেয়েছি। অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে আমার কার্যালয় থেকে লোক পাঠিয়ে তদন্ত করা হয়েছে। তদন্ত শেষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
নূরুল আমিনের মূল প্রশ্ন হলো—১৯৯৮, ২০১১, ২০১৭ ও ২০২২ সালের ওয়ারিশ সনদে যাঁদের নাম ছিল না, ২০২৬ সালের সনদে তাঁদের নাম কীভাবে এলো; ২০১৮ সালের প্রশাসনিক আদেশে বাতিল হওয়া খারিজি খতিয়ানের সঙ্গে নতুন ওয়ারিশ সনদের সম্পর্ক কী; এবং বিভিন্ন সময়ের ভোটার তালিকা, কাবিননামা, জাতীয় পরিচয়পত্র ও অন্যান্য নথিতে থাকা পরিচয়গত তথ্যের মধ্যে জালিয়াতি ও অনিয়ম হয়েছে ।

তিনি দাবী করেন, এসব প্রশ্নের উত্তর মিলবে পুরোনো ওয়ারিশ সনদ, ১৯৬৯ সালের মামলার সম্পূর্ণ নথি, ২০১৮ সালের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব)-এর আদেশ, সংশ্লিষ্ট খারিজি খতিয়ান, ভোটার তালিকা এবং ২০২৬ সালের নতুন ওয়ারিশ সনদ সরেজমিনে ও নথিভিত্তিকভাবে যাচাই হলে।