নানীর সঙ্গে শেষ দেখাটাও হলো না আরমানের, সড়কেই ঝরল প্রাণ
সাইফুল ইসলাম ফাহাদ:
নানীকে একনজর দেখার আকুলতা নিয়ে সুদূর সিলেট থেকে কুমিল্লায় ছুটে এসেছিলেন আরমান হোসেন (২৪)। কথা ছিল, প্রিয় নানীর কাছে গিয়ে তাঁর খোঁজখবর নেবেন, কিছুটা সময় কাটাবেন। কিন্তু সেই দেখা আর হলো না। নানীর বাড়িতে পৌঁছানোর আগেই ঘাতক ট্রাকের ধাক্কায় সড়কেই নিভে গেল তাঁর জীবনের আলো। আদরের নাতিকে হারিয়ে দিশেহারা সত্তরোর্ধ্ব নানী রাবেয়া খাতুনের বুকফাটা আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠেছে চারপাশের পরিবেশ।
শুক্রবার (৯ অক্টোবর) সকাল ৬টার দিকে কুমিল্লা-সিলেট আঞ্চলিক মহাসড়কের দেবিদ্বার উপজেলার চরবাকর বাসস্ট্যান্ডসংলগ্ন রাসেল ব্রিকসের কাছে এ মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় অটোরিকশাচালকও গুরুতর আহত হয়েছেন।
স্থানীয় ও পুলিশ সূত্রে জানা যায়, কুমিল্লার দেবিদ্বার পৌর এলাকার ভিংলাবাড়ি গ্রামে নানীর বাড়িতে যাওয়ার উদ্দেশ্যে বৃহস্পতিবার রাতে সিলেট থেকে ট্রেনে কুমিল্লায় পৌঁছান আরমান হোসেন। পরে শুক্রবার ভোরে কোম্পানীগঞ্জগামী একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশায় করে গন্তব্যের উদ্দেশে রওনা হন তিনি।
পথিমধ্যে চরবাকর এলাকায় পৌঁছালে বিপরীত দিক থেকে আসা কুমিল্লাগামী একটি দ্রুতগতির ট্রাক অটোরিকশাটিকে সজোরে ধাক্কা দেয়। এতে অটোরিকশাটি সড়কের পাশে ছিটকে পড়ে দুমড়েমুচড়ে যায়। দুর্ঘটনায় ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান আরমান। গুরুতর আহত হন অটোরিকশাচালক।
নিহত আরমান হোসেন সিলেট জেলার বিয়ানীবাজার উপজেলার ফতেহপুর গ্রামের ফখরুল ইসলামের ছেলে। তিনি পেশায় একজন মোটরসাইকেল মেকানিক ছিলেন।
আরমানের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে ঘটনাস্থলে ছুটে আসেন তাঁর স্বজনেরা। প্রিয়জনকে হারানোর শোকে কান্নায় ভেঙে পড়েন তাঁরা। তবে সবচেয়ে হৃদয়বিদারক দৃশ্য ছিল নানী রাবেয়া খাতুনের আহাজারি।
স্বামী ও পুত্রহীন সত্তরোর্ধ্ব রাবেয়া খাতুনের কাছে আরমান ছিলেন শেষ আশ্রয় ও ভরসার মানুষ। নাতিকে হারিয়ে কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, “আমার কেউ ছিল না, এই নাতিটাই ছিল আমার শেষ ভরসা। সুযোগ পেলেই আমার খোঁজ নিতে ছুটে আসতো, ডাক্তারের কাছে নিয়ে যেতো। নানীর প্রতি তার ভালোবাসার কমতি ছিল না। আজ আমার সব শেষ হয়ে গেল, এখন আমাকে দেখার মতো আর কেউ রইল না।”
নাতির প্রতি গভীর ভালোবাসা আর তাকে হারানোর অসহনীয় বেদনায় রাবেয়া খাতুনের এই আহাজারিতে উপস্থিত স্বজন ও স্থানীয়দের চোখেও অশ্রু চলে আসে। নানীকে দেখতে সিলেট থেকে ছুটে আসা আরমানের শেষযাত্রা যেন এক মুহূর্তেই কেড়ে নিল বৃদ্ধার বেঁচে থাকার শেষ অবলম্বন।
এদিকে দুর্ঘটনার পর মহাসড়কে দীর্ঘ সময় যান চলাচল ব্যাহত হয়। সড়কে মরদেহ পড়ে থাকায় কুমিল্লা-সিলেট আঞ্চলিক মহাসড়কের উভয় পাশে শত শত যানবাহন আটকা পড়ে। এতে ওই সড়কে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয় এবং ভোগান্তিতে পড়েন যাত্রীরা।
পরে সকাল ১০টার দিকে দেবিদ্বার থানা-পুলিশ ও হাইওয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। এরপর ধীরে ধীরে যান চলাচল স্বাভাবিক হয়।
মিরপুর হাইওয়ে পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ আনিসুর রহমান জানান, পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে নিহত আরমানের মরদেহ উদ্ধার করেছে। দুর্ঘটনাকবলিত সিএনজিচালিত অটোরিকশাটি জব্দ করে ফাঁড়িতে নেওয়া হয়েছে। এ ঘটনায় প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ ও মামলা দায়েরের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।
একটি দুর্ঘটনায় থেমে গেল ২৪ বছরের আরমানের জীবন। আর নানী রাবেয়া খাতুনের জীবনে নেমে এলো এমন এক শূন্যতা, যা কোনো সান্ত্বনাতেই পূরণ হওয়ার নয়। নানীকে শেষবারের মতো দেখার যে আকাঙ্ক্ষা নিয়ে তাঁর এই ছুটে আসা, তা অপূর্ণই রয়ে গেল চিরদিনের জন্য।