,

দৌলতগঞ্জের তেলকলশিল্পে ধস, বন্ধের মুখে ঐতিহ্যের শেষ ৬ কারখানা

আজকের কুমিল্লা ডট কম :
October 14, 2026
news-image

রিয়াদ হোসাইন:

একসময় সরিষার তেলের ঘ্রাণ, কলের শব্দ আর জমজমাট বেচাকেনায় মুখর থাকত কুমিল্লার লাকসামের দৌলতগঞ্জ বাজার। এ বাজারে গড়ে উঠেছিল ৩৬টিরও বেশি তেলকল। এসব তেলকল ঘিরে গড়ে উঠেছিল বহু মানুষের কর্মসংস্থান ও জীবিকা। তবে সময়ের পরিবর্তন, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং বাজারে প্রতিযোগিতাসহ নানা সংকটে ঐতিহ্যবাহী তেলকলশিল্প এখন অস্তিত্বসংকটে। ২০২৬ সালে বাজারটিতে চালু রয়েছে মাত্র ছয়টি তেলকল। সেগুলোও বন্ধ হওয়ার আশঙ্কায় রয়েছেন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা।

লাকসাম উপজেলা প্রশাসনের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, দৌলতগঞ্জ বাজার এ অঞ্চলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যকেন্দ্র। দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয় অর্থনীতি, ব্যবসা-বাণিজ্য ও কর্মসংস্থানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে আসছে বাজারটি। কিন্তু তেলকলশিল্পের ক্রমাগত সংকোচনে হারিয়ে যেতে বসেছে বাজারটির ঐতিহ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

৩৬ থেকে নেমে ছয় তেলকলে
একসময় দৌলতগঞ্জ বাজারে ৩৬টিরও বেশি তেলকল চালু ছিল। ২০২৫ সালের ৪ আগস্ট প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে তখন মাত্র পাঁচটি তেলকল সচল থাকার তথ্য উঠে আসে। বর্তমানে ২০২৬ সালে স্থানীয়ভাবে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, বাজারটিতে ছয়টি তেলকল চালু রয়েছে। তবে ব্যবসায়ীদের দাবি, এসব তেলকলও নানা সংকটে বন্ধ হওয়ার পথে।

চালু থাকা তেলকলগুলো হলো বাবুল অয়েল মিল, ন্যাশনাল অয়েল মিল, পুতুল অয়েল মিল, জেআর অয়েল মিল, শাহা অয়েল মিল ও কোহিনুর অয়েল মিল। একসময় যে শিল্পকে কেন্দ্র করে বহু শ্রমিকের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছিল, সেই শিল্পের ভবিষ্যৎ নিয়ে এখন উদ্বেগ বাড়ছে।

উৎপাদন ব্যয় ও বাজার প্রতিযোগিতায় সংকট
তেলকল মালিকদের ভাষ্য অনুযায়ী, সরিষার উচ্চমূল্য, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, বাজারে সস্তা ভোজ্যতেলের সঙ্গে প্রতিযোগিতা এবং খৈল বিক্রিতে মন্দার কারণে ব্যবসা পরিচালনা কঠিন হয়ে পড়েছে। এসব কারণে অনেক তেলকল বন্ধ হয়ে গেছে। অবশিষ্ট তেলকলগুলোও টিকে থাকার চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করছে।

তেলকলের সঙ্গে সরিষার তেল উৎপাদনের পাশাপাশি খৈল ব্যবসা ও শ্রমিকদের জীবিকাও জড়িত। ফলে এ শিল্পের সংকোচন শুধু ব্যবসায়ীদের নয়, শ্রমজীবী মানুষের জীবনেও প্রভাব ফেলছে।

কমেছে শ্রমিকদের কর্মসংস্থান
স্থানীয় ব্যবসায়ী ইব্রাহীম বলেন, “আগে দৌলতগঞ্জ বাজারের তেলকলগুলোতে অনেক শ্রমিক কাজ করতেন। দিনরাত তেল উৎপাদন হতো। আমাদেরও ভালো কাজের সুযোগ ছিল। এখন অনেক তেলকল বন্ধ হয়ে গেছে, আর যেগুলো চালু আছে, সেগুলোতেও আগের মতো কাজ নেই। আয় কমে যাওয়ায় সংসার চালাতে কষ্ট হচ্ছে। আমরা চাই, সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এগিয়ে এসে তেলকলগুলো টিকিয়ে রাখার উদ্যোগ নিক, যাতে আমাদের কর্মসংস্থানও বজায় থাকে।

মেসার্স বাবুল অয়েল মিলের স্বত্বাধিকারী ছায়ীদুর রহমান বাবু বলেন, একসময় লাকসামের দৌলতগঞ্জ বাজারে প্রায় ৩৬টি তেলকল চালু ছিল। এসব মিলে অনেক মানুষের কর্মসংস্থান হতো এবং স্থানীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখত। কিন্তু বর্তমানে উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি, সরিষার উচ্চমূল্য, বাজারে প্রতিযোগিতা ও খৈল বিক্রিতে মন্দার কারণে ব্যবসা পরিচালনা করা কঠিন হয়ে পড়েছে। সরকারি নীতিগত সহায়তা ও প্রয়োজনীয় উদ্যোগ না পেলে আমাদের পূর্বপুরুষের এই ঐতিহ্য ধরে রাখা কঠিন হবে।

জরাজীর্ণ পুরোনো দৈনিক বাজার
দৌলতগঞ্জ বাজারের ঐতিহ্য ও অবকাঠামো নিয়ে উদ্বেগের আরেকটি দিক হলো ব্যাংক রোডসংলগ্ন পুরোনো দৈনিক বাজার। ২০২৪ সালের ৮ মে প্রকাশিত একটি স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বাজারটির জরাজীর্ণ অবস্থা, দুর্গন্ধ এবং ভেতরের চলাচলের পথ সংকুচিত হওয়ার অভিযোগ উঠে আসে। প্রতিবেদনে কিছু জায়গায় দোকানঘর নির্মাণের বিষয়ও উল্লেখ করা হয়েছিল।

বাজারটির বর্তমান অবস্থা সরেজমিনে পর্যালোচনা করে পরিচ্ছন্নতা, চলাচলের পরিবেশ ও অবকাঠামোগত উন্নয়নে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

ঐতিহ্য রক্ষায় প্রয়োজন কার্যকর উদ্যোগ
দৌলতগঞ্জ বাজারের তেলকলশিল্প টিকিয়ে রাখতে ব্যবসায়ীদের সমস্যা চিহ্নিত করা, উৎপাদন ব্যয় কমাতে সহায়তা, বাজারজাতকরণের সুযোগ বৃদ্ধি এবং প্রয়োজনীয় নীতিগত সহযোগিতার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা যেতে পারে। একই সঙ্গে অবশিষ্ট ছয়টি তেলকলের ইতিহাস ও ঐতিহ্য সংরক্ষণ এবং পুরোনো দৈনিক বাজারের পরিবেশ উন্নয়নেও উদ্যোগ প্রয়োজন।

একসময় ৩৬টিরও বেশি তেলকলের কর্মচাঞ্চল্যে মুখর দৌলতগঞ্জ বাজারে এখন টিকে আছে মাত্র ছয়টি। সেগুলোও বন্ধের আশঙ্কায় থাকায় স্থানীয় অর্থনীতি ও শ্রমিকদের কর্মসংস্থান নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সময়মতো উদ্যোগ না নিলে লাকসামের ঐতিহ্যবাহী তেলকলশিল্প একদিন পুরোপুরি হারিয়ে যেতে পারে এমন আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা।