,

ষড় ঋতুর পালাক্রমের ছোঁয়ায় কুবিতে শীতের আগমনী বার্তা

আজকের কুমিল্লা ডট কম :
October 5, 2026
news-image

জান্নাতুল ফেরদৌস প্রীতি, কুবি:

হেমন্তের নরম রোদ আর ভোরের কুয়াশার সঙ্গে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের লালমাটির পথঘাটে শুরু হয়েছে ঋতুর পালাবদলের আবহ। ঘাসের ডগায় জমে থাকা শিশির, মৃদু হাওয়া আর পাতার ফাঁক গলে আসা মৃদু রোদ, গাছের পাতাগুলো ঝরে পড়তে শুরু করা—জানান দিচ্ছে যেন দরজায় কড়া নাড়ছে শীত।

শহরের কোলাহল থেকে কিছুটা দূরে লালমাটির উঁচু-নিচু টিলা ও সবুজে ঘেরা কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৃতিতে ঋতুবদলের ছাপও খুব স্পষ্ট। এখানে শীত শুধু ক্যালেন্ডারের একটি ঋতু নয়; প্রকৃতির রং, বাতাসের গন্ধ এবং ক্যাম্পাসের চেনা দৃশ্যপটেও নিয়ে আসে ভিন্নতা।

ভোরে ক্যাম্পাসে পা রাখলেই চোখে পড়ে সেই অপরূপ পরিবর্তন। রাতের শিশিরে ভিজে থাকে ঘাস। লালমাটির পথের ওপর সকালের মৃদু রোদ তৈরি করে সোনালি আভা। কোথাও পাতার আড়ালে পাখির ডাক, কোথাও টিলার ঢালে দাঁড়িয়ে থাকা গাছপালা। ব্যস্ত ক্লাস শুরুর আগে এই পরিবেশ ক্যাম্পাসজীবনে এনে দেয় কিছুটা স্বস্তি।

ক্যাম্পাসের তালগাছগুলোতে ঝুলে থাকা বাবুই পাখির বাসা শীতের আগমনী দৃশ্যকে আরও স্বতন্ত্র করে তুলেছে। বাতাসে দুলতে থাকা পাখির এই বাসাগুলো দূর থেকে মনে হয় প্রকৃতির হাতে তৈরি ছোট ছোট স্থাপনা। কখনো বাবুইয়ের আনাগোনা, আবার কখনো নিস্তব্ধ বাসা—তালগাছগুলো যেন ক্যাম্পাসের নিজস্ব এক প্রাকৃতিক গল্প তুলে করছে।

কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষ্ণচূড়া রোডও প্রকৃতিপ্রেমীদের কাছে প্রিয় একটি স্থান। রাস্তার দুই পাশে থাকা কৃষ্ণচূড়া গাছগুলো এখন ফুলহীন হলেও তাদের ছায়া, শাখা-প্রশাখা ও দীর্ঘ পথ ক্যাম্পাসের সৌন্দর্যে ভিন্ন মাত্রা যোগ করেছে। এই পথ ধরে এগিয়ে গেলে দেখা মেলে শহীদ মিনারের। লালমাটির পথ, সবুজের আবরণ এবং দূরে দাঁড়িয়ে থাকা শহীদ মিনার—সব মিলিয়ে এখানে প্রকৃতি ও ইতিহাসের এক নীরব মেলবন্ধন চোখে পড়ে।

শীতের সকালে কৃষ্ণচূড়া রোডের দৃশ্য আরও বদলে যায়। সূর্যের আলো তখন তীব্র নয়, বরং কোমল। টিলার গায়ে আলো-ছায়ার পরিবর্তন পরিচিত দৃশ্যকেও নতুন করে তুলে ধরে। এই পথ ধরে কেউ ক্লাসে ছুটছেন, কেউ বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিচ্ছেন, আবার কেউ নিরিবিলি পরিবেশ উপভোগ করছেন। ক্যাম্পাসের ব্যস্ততার মাঝেও শীত যেন সময়কে কিছুটা ধীর করে দেয়।

কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের লালমাটির ভূপ্রকৃতিও এই ঋতুর সৌন্দর্যকে ভিন্ন করে তোলে। বর্ষায় বৃষ্টিতে ভেজা মাটি শীতের শুরুতে শুকিয়ে রুক্ষ রূপ নেয়। টিলার ঢালে লালমাটির সঙ্গে চারপাশের সবুজের বৈপরীত্য তৈরি করে ক্যাম্পাসের স্বতন্ত্র প্রাকৃতিক দৃশ্য।

দুপুরে সূর্যের তেজ কিছুটা বাড়লেও বিকেল নামার সঙ্গে সঙ্গে আবার বদলে যায় ক্যাম্পাসের সেই চিরচেনা আঙিনা। গাছের পাতার ফাঁক দিয়ে শেষ বিকেলের আলো পথজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। দীর্ঘ ছায়া ধীরে ধীরে মিলিয়ে যায় সন্ধ্যার আবছায়ায়। পাখিরা ফিরে যায় আপন নীড়ে। দিনের ব্যস্ততা শেষে ক্যাম্পাস তখন যেন ফিরে পায় তার স্নিগ্ধ-শান্ত রূপ।

ঋতুবদলের এই দৃশ্যের সবচেয়ে কাছের সাক্ষী কুবির শিক্ষার্থীরা। তাদের কাছে শীত মানে শুধু কুয়াশা কিংবা শীতের পোশাক নয়; বরং ক্লাসের ফাঁকে রোদ পোহানো, বন্ধুদের সঙ্গে ক্যাম্পাসের কৃষ্ণচূড়া রোডে হাঁটা, টিলার ঢালে বসে গল্প-আড্ডায় মেতে ওঠা, পড়ন্ত বিকেলের আলোয় ছবি তোলা কিংবা কাঁঠালতলার ছায়ায় কোনো জায়গায় বসে বই পড়া।

প্রকৃতির এই পরিবর্তন শিক্ষার্থীদের দৈনন্দিন ব্যস্ততার মাঝেও কিছুটা প্রশান্তির সৃষ্টি করে। লালমাটির পথ, সবুজ গাছপালা, তালগাছে বাবুইয়ের বাসা, কৃষ্ণচূড়া রোড, উঁচু-নিচু টিলা ও শহীদ মিনার—সবকিছু মিলিয়ে ঋতুর সঙ্গে সঙ্গে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ও যেন ধারণ করে নতুন এক রূপ।

শীত এখনো পুরোপুরি নামেনি। তবে তার আগমনী বার্তা স্পষ্ট—ভোরের মৃদু হাওয়ায়, ঘাসের শিশিরে, পাতার মর্মর আওয়াজে আর নরম রোদের উষ্ণতায়। হেমন্ত পেরিয়ে শীতের পথে এগিয়ে চলেছে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়। আর সেই অপেক্ষায় চেনা ক্যাম্পাসটিই যেন প্রতিদিন একটু একটু করে নতুন করে সেজে উঠছে।